বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি আরও বাড়ছে, বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
- আপডেট সময় : ১২:০০:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫ ১৯৮ বার পড়া হয়েছে

মোঃ মকবুলার রহমান
নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:
বাংলাদেশে আসন্ন বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘনত্ব ও তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। পর্যাপ্ত সতর্কতা ব্যবস্থা ও প্রতিরোধ অবকাঠামোর অভাবে গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। বাসস সুত্রে এমনটি জানা গেছে।
আজ সোমবার বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল মান্নান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কৃষিকাজ ও মাছ ধরার মতো বাইরের কাজে নিয়োজিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বজ্রপাতের প্রধান ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তাদের সতর্কতা গ্রহণ ও সুরক্ষা অবকাঠামোর সুযোগ সীমিত।
তার মতে, চলমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে বজ্রপাতজনিত দুর্যোগের হার ক্রমেই বাড়ছে। বর্ষা মৌসুমের আগে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত এবং বিজলি চমকের হার আরও বাড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ড. মান্নান বলেন, আগে যেসব এলাকায় বজ্রপাত কম হতো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেসব এলাকাতেও এখন ঘন ঘন বজ্রপাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিবছর গড়ে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশ।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে বজ্রপাত বৃদ্ধির সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত। উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলে শক্তি সঞ্চালন বেড়ে যাওয়ায় বজ্রপাতের মাত্রা ও তীব্রতা উভয়ই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গতকাল ৫ অক্টোবর দেশের চারটি জেলায় বজ্রপাতে অন্তত আটজনের মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞের মতে, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে—বাংলাদেশের প্রাক-বর্ষা মৌসুমে কনভেক্টিভ অ্যাভেইলেবল পটেনশিয়াল অ্যানার্জি (CAPE) প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
এছাড়া, বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়া বজ্রপাতের আরেকটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মান্নান বলেন, বাংলাদেশে বায়ুদূষণ বৃদ্ধির সঙ্গে বজ্রপাতের ঘনত্ব বৃদ্ধির একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তিনি আরও জানান, গ্রামীণ এলাকায় অতিরিক্ত গাছ কেটে ফেলার কারণে প্রাকৃতিকভাবে বজ্রপাত প্রতিরোধের সুযোগও কমে গেছে। আগে উঁচু গাছগুলো বজ্রপাতের প্রধান আকর্ষণবিন্দু হিসেবে কাজ করলেও এখন মানুষই ঝুঁকিতে রয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও বাংলাদেশ প্রাক-বর্ষা মৌসুমে তীব্র বজ্রপাতের প্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। উচ্চ আর্দ্রতা, বাড়তি তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় অস্থিরতা বজ্রপাতের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে।
এক সাম্প্রতিক আঞ্চলিক গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। এর মূল কারণ হলো গ্রামীণ অঞ্চলের ঘনবসতি এবং মাঠে বিপুল সংখ্যক মানুষের অবস্থান।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময়টি বজ্রপাতের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩০০ জন মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারান, যার মধ্যে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট অঞ্চলে মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি।
২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে বছরে ১২০টিরও বেশি বজ্রপাতের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশ সরাসরি মাটিতে আঘাত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, সচেতনতা বৃদ্ধি ও গাছ সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে।


























