ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ দখল করতে চায় হুতিরা
- আপডেট সময় : ০৫:৫৩:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে

চার বছরের যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইয়েমেনে যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা এখন রক্তক্ষয়ী মোড়ে এসে পৌঁছেছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ এখন গৃহযুদ্ধের মূল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রায় ছয় লাখ জনসংখ্যার এই শহরটি একদিকে যেমন ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্যবস্তু, অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শহরের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি লড়াইয়ে তাইজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কৌশলগত ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে তাইজের গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই শহরের এক পাশে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের কেন্দ্রস্থল এডেন এবং অন্য পাশে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনে বাব আল-মান্দেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। তাইজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে বাব আল-মান্দেব সংলগ্ন অঞ্চলে সরকারের সামরিক তৎপরতা চালানো দুষ্কর হয়ে পড়বে এবং এডেনের দিকে হুতিদের অগ্রযাত্রার পথ মসৃণ হবে। ফলে তাইজের পতন হলে তা সরকারের জন্য কেবল একটি সামরিক পরাজয় হবে না, বরং রাজনৈতিক ও প্রতীকীভাবে বড় এক ধাক্কা হিসেবে গণ্য হবে।
সাময়িক অবরুদ্ধতার কারণে তাইজের ভেতরে মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। শহরের দক্ষিণে জাবাল সাবার পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া এডেন সংযোগকারী প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান সামরিক সড়কটির নিয়ন্ত্রণ সম্প্রতি হুতিদের হাতে চলে গেছে। অক্টোবরের শুরু থেকেই আল-তুরবাহ ও মুদিরিয়াত আল-মিসরাখসহ সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হুতিরা শহরটিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। সরকারি বাহিনী সৌদি জোটের বিমান হামলার সহায়তায় অবরুদ্ধ সড়কটি চালুর চেষ্টা চালালেও অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, বরং সরকারি বাহিনী আশপাশের আরও কিছু এলাকা হারিয়েছে।
ইতিহাসের পাতায় তাইজ দীর্ঘদিন ধরেই উত্তর ইয়েমেনের শাসকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় শহরটি সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল, যার ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিনের শাসক আলি আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা হারান। ধর্মীয় দিক থেকে হুতিরা শিয়া ইসলামের জায়দি মতাদর্শের অনুসারী হলেও তাইজের সিংহভাগ মানুষ সুন্নি মুসলিম। তবে এই বিরোধ কেবল ধর্মীয় নয়; এর নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার সংগ্রাম ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের দাবি। ২০১৪ সালে হুতি ও সালেহ জোট বেঁধে রাজধানী সানা দখল করার পর ২০১৫ সালে তাইজে সালেহের অনুগত সেনারা অবস্থান নিলে তা অভ্যুত্থানবিরোধী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ লড়াই ও অবরুদ্ধ দশার মধ্য দিয়ে স্থানীয় যোদ্ধাদের সহায়তায় সরকারি বাহিনী শহরটি পুনরুদ্ধার করেছিল।
সাম্প্রতিক এই লড়াইয়ের ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যমতে, তাইজ প্রদেশে অন্তত ১ লাখ ২১ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্যদিকে ইয়েমেন সরকারের মতে, শহর ও সংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। জ্বালানি, পানীয় জল ও ওষুধের তীব্র সংকটের মাঝে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) অক্টোবরের মাঝামাঝি হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে শহরে গমের আটার মজুত প্রায় শেষ। পাশাপাশি ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, ইয়েমেনে পরীক্ষা করা প্রতি তিন শিশুর একজন অপুষ্টিতে ভুগছে এবং কলেরার পাশাপাশি ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সংগঠনে হুতিরা আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে এবং সৌদি লক্ষ্যবস্তুতে তাদের হামলাও বেড়েছে। তারা তাইজকে স্থায়ী অবরোধে রাখা বা সরাসরি শহরটি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে স্থানীয়দের তীব্র হুতিবিরোধী মনোভাবের কারণে শহর দখলের যেকোনো সামরিক অভিযান দীর্ঘ ও অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। তাইজের এই চূড়ান্ত লড়াইয়ের ওপরই এখন নির্ভর করছে দক্ষিণ ইয়েমেনে সরকারের ভিত্তি, বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা এবং পুরো ইয়েমেন গৃহযুদ্ধের ভবিষ্যৎ গতিপথ।




























