ঢাকা ০৩:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শ্রীমঙ্গলে বই পড়ে ল্যাপটপ পেলেন ৮ শিক্ষার্থী মক্কায় ওমরাহ পালন করে আবেগঘন পোস্ট অভিনেত্রী কেয়া পায়েলের কাফকার সাহিত্য ও ক্ষমতার জটিল সমীকরণ: এক গভীর বিশ্লেষণ আওয়ামী লীগ নতুন ষড়যন্ত্র করতে পারে, সতর্ক থাকার আহ্বান টুকুর নবাবগঞ্জে নানা কর্মসূচিতে চড়ারহাট গণহত্যা দিবস পালন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস: কর্মকর্তাদের দিকে সন্দেহের আঙুল গেতাফে ম্যাচে বার্সেলোনার একাদশে জেসুস, রাফিনিয়াকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা বেলকুচিতে অটোভ্যান চালককে হত্যার পর লাশ বালুচাপা, ৪ দিন পর উদ্ধার ২০২৬ বিশ্বকাপে অনলাইনে সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষের শিকার আর্জেন্টিনা কুষ্টিয়ায় সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ এমপি আমির হামজার

বিভ্রান্তিকর ফ্রেমিংয়ে সত্যের বিকৃতি: সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৩:৪১:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



বাংলা সাহিত্যে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে- ‘আম কুড়াতে গিয়ে ছাল তোলা’ কিংবা খনার বচন- ‘না জেনে না বুঝে কোরো না কাজ, শেষে পাবে লোকমাঝারে লাজ’। তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে খনার এই অমর বাণী যেন প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে চরম সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের ফলে আজকের যুগে তথ্য আদান-প্রদান যেমন সহজ ও দ্রুত হয়েছে, তেমনি অসত্য, অপূর্ণাঙ্গ কিংবা আবেগে তাড়িত হয়ে তথ্য ফ্রেমিং করার মারাত্মক ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা এবং সেটিকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক জলঘোলা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, তা আমাদের সমাজের এক গভীর ব্যাধিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ঘটনাটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দুঃখজনক। একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের স্বপ্নের স্টুডিও ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। আইনত এটি একটি স্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ। যে কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সম্পত্তি রক্ষা করার প্রাথমিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সরকারের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় পূর্ণ সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা এই বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু ঘটনার পরপরই যে তথ্য পরিবেশন ও রাজনৈতিক ট্যাগিং শুরু হলো, তা আধুনিক সাংবাদিকতা ও দায়িত্বশীল তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইভে এসে সালমান মুক্তাদির অভিযোগ তুলেছিলেন, বিএনপির লোকজন তার কাছে চাঁদা দাবি করেছিল এবং চাঁদা না পেয়ে স্টুডিওতে হামলা চালিয়েছে। মুহূর্তে সেই খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের মূলধারার বেশ কিছু গণমাধ্যমেও যাচাই-বাছাই ছাড়া ‘বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ পরিবেশিত হয়। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠ উন্মোচিত হতে বেশি সময় লাগেনি। পরবর্তীকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সালমান মুক্তাদির নিজেই স্বীকার করেন, তার কাছে সরাসরি কোনো চাঁদা দাবি করা হয়নি। এমনকি তার বাড়ির মালিক বা ল্যান্ডলর্ডের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল কিনা, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। অর্থাৎ, প্রাথমিক লাইভে যে তথ্যটি এক প্রকার নির্দ্বিধায় দেশবাসীর কাছে পরিবেশন করা হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণরূপে অসমর্থিত এবং ধারণানির্ভর।

দুই বক্তব্যের মাঝখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং ও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে আসে ঘটনার মূল রহস্য। তদন্তে দেখা যায়, এটি মূলত ‘নিউগিনি প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার মধ্যবর্তী দীর্ঘদিনের বিতর্কিত জমির বিরোধ বা ডিসপিউট। ওই বিতর্কিত জমিতে নির্মিত একটি টিনশেড ঘরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। দুই পক্ষের দখল ও পুনরুদ্ধারের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে দুর্ভাগ্যবশত স্টুডিওটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, ঘটনার সাথে ঢালাও চাঁদাবাজির কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না।

আজকের যুগে একজন তথাকথিত ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ বা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের প্রভাব প্রথাগত অনেক গণমাধ্যমের চেয়ে নিছক কম নয় বরং বেশি। তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁদের একটি একক লাইভ বা ভিডিও বিশাল বার্তা পৌঁছে দেয়। লক্ষ লক্ষ অনুসারী যাঁদের বক্তব্য শোনে, তাঁদের কাঁধে দায়িত্বের বোঝা সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি হওয়া উচিত। যখন এরপর একজন ব্যক্তি লাইভে এসে বলেন, ‘অমুক দলের লোক চাঁদা চেয়েছে’, তখন সেটি কেবল একটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা আক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মুহূর্তের মধ্যে সেটি লাখ লাখ মানুষের কাছে রাজনৈতিক সত্য বা ন্যারেটিভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে যখন মূল তথ্য উন্মোচিত হয় এবং দেখা যায়, ঘটনাটি জমির দখল-সংক্রান্ত বিরোধ, ততক্ষণে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি হওয়ার কথা, তা হয়ে যায়। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সময়োপযোগীভাবে উল্লেখ করেছেন- অনলাইন মাধ্যমে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে। তাৎক্ষণিক আবেগ বা অনুভূতির বশবর্তী হয়ে যাচাই ছাড়া কথা বললে তা সমাজে মারাত্মক ‘মিসইনফরমেশন’ বা অপতথ্য ছড়ায়।

গণমাধ্যমের ইতিহাসে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ বা ‘স্পেকুলেটিভ রিপোর্টিং’-এর বিরুদ্ধে সব সময় সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এখন নতুন যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা হলো ‘ইনস্ট্যান্ট জাজমেন্ট’ বা তাৎক্ষণিক বিচারক সেজে যাওয়া। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘কথা মুখ থেকে বের হলে আর ফেরানো যায় না, ধনুক থেকে তীর ছুটলে আর আটকানো যায় না’। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ধারণা পরবর্তীকালে সংশোধন করলেও সমাজে যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, তার দায় কে নেবে? বর্তমান ডিজিটাল যুগে কেবল কন্টেন্ট তৈরি করলেই চলে না, বরং সেই কন্টেন্টের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও আইনি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও স্পষ্ট জ্ঞান থাকা আবশ্যক। একেই বলা হয়, সাইবার লিটারেসি বা ডিজিটাল মাধ্যমের সচেতনতা। একজন ব্যক্তি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হন, তখন আইনের আশ্রয় নেওয়া ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করাই প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হওয়া উচিত। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সহানুভূতি বা ‘ভাইরাল’ হওয়ার তাড়নায় যখন আদালতের রায়ের আগেই ব্যক্তি বা দলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন প্রকৃত বিচার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমরা জানি ‘অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী, না জেনে বলা আরো ক্ষতিকারী’। তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে কেবল ব্যক্তি সালমান মুক্তাদির নন, সমাজের আরো বহু মানুষ এই ধরনের অপতথ্যে গা ভাসিয়ে দিতে পারেন। যার শিকার কেবল যে বিএনপি হবে সেটা নয়, যে কোনো ব্যক্তি অপতথ্যের শিকার হয়ে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারেন। একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরকে বুঝতে হবে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বলা প্রতিটি শব্দ একটি স্থায়ী নথির মতো থেকে যায়, যা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই কোনো নির্দোষ ব্যক্তি বা সংগঠনের ওপর অন্যায় তকমা এঁটে দেওয়া সম্ভব। তাই জনপরিসরে কথা বলার আগে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের ওপর আস্থা রাখা সভ্য সমাজের অন্যতম শর্ত।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামাজচর্চায় বেশ কিছু দিন ধরে এক অদ্ভ‍ুত ও বিষাক্ত ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেই সত্য-মিথ্যা বা তদন্তের তোয়াক্কা না করে বিরোধী বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে ঢালাওভাবে দায়ী করার এক অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এটি যেন এক ধরনের ‘সিস্টেমিক ব্লেম গেম’। যেমনটি এই ঘটনায় দেখা গেল- তদন্ত শুরুর আগেই উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এনসিপির নেতারা সরকারের তথা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নামে ‘প্রতীকী ভিক্ষার বাক্স’ খুলে চাঁদাবাজির ভিত্তিহীন তকমা সেঁটে দেওয়ার এক রাজনৈতিক নাটক রচনার চেষ্টা করা হলো। অথচ পুলিশের ডিবি শাখা কর্তৃক তদন্তে যখন নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার এই ঘটনায় পরবর্তীকালে পুলিশ যে ছয় জনকে গ্রেপ্তার করেছে, তাদের মধ্যে শাহ আলম অনিক ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক’।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

নিউজটি শেয়ার করুন

বিভ্রান্তিকর ফ্রেমিংয়ে সত্যের বিকৃতি: সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা

আপডেট সময় : ০৩:৪১:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলা সাহিত্যে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে- ‘আম কুড়াতে গিয়ে ছাল তোলা’ কিংবা খনার বচন- ‘না জেনে না বুঝে কোরো না কাজ, শেষে পাবে লোকমাঝারে লাজ’। তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে খনার এই অমর বাণী যেন প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে চরম সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের ফলে আজকের যুগে তথ্য আদান-প্রদান যেমন সহজ ও দ্রুত হয়েছে, তেমনি অসত্য, অপূর্ণাঙ্গ কিংবা আবেগে তাড়িত হয়ে তথ্য ফ্রেমিং করার মারাত্মক ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনা এবং সেটিকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক জলঘোলা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, তা আমাদের সমাজের এক গভীর ব্যাধিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

ঘটনাটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দুঃখজনক। একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের স্বপ্নের স্টুডিও ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। আইনত এটি একটি স্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ। যে কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সম্পত্তি রক্ষা করার প্রাথমিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সরকারের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় পূর্ণ সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা এই বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু ঘটনার পরপরই যে তথ্য পরিবেশন ও রাজনৈতিক ট্যাগিং শুরু হলো, তা আধুনিক সাংবাদিকতা ও দায়িত্বশীল তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইভে এসে সালমান মুক্তাদির অভিযোগ তুলেছিলেন, বিএনপির লোকজন তার কাছে চাঁদা দাবি করেছিল এবং চাঁদা না পেয়ে স্টুডিওতে হামলা চালিয়েছে। মুহূর্তে সেই খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের মূলধারার বেশ কিছু গণমাধ্যমেও যাচাই-বাছাই ছাড়া ‘বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ পরিবেশিত হয়। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠ উন্মোচিত হতে বেশি সময় লাগেনি। পরবর্তীকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সালমান মুক্তাদির নিজেই স্বীকার করেন, তার কাছে সরাসরি কোনো চাঁদা দাবি করা হয়নি। এমনকি তার বাড়ির মালিক বা ল্যান্ডলর্ডের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল কিনা, সে বিষয়েও তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। অর্থাৎ, প্রাথমিক লাইভে যে তথ্যটি এক প্রকার নির্দ্বিধায় দেশবাসীর কাছে পরিবেশন করা হয়েছিল, তা ছিল সম্পূর্ণরূপে অসমর্থিত এবং ধারণানির্ভর।

দুই বক্তব্যের মাঝখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং ও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে আসে ঘটনার মূল রহস্য। তদন্তে দেখা যায়, এটি মূলত ‘নিউগিনি প্রপার্টিজ লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার মধ্যবর্তী দীর্ঘদিনের বিতর্কিত জমির বিরোধ বা ডিসপিউট। ওই বিতর্কিত জমিতে নির্মিত একটি টিনশেড ঘরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। দুই পক্ষের দখল ও পুনরুদ্ধারের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে দুর্ভাগ্যবশত স্টুডিওটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, ঘটনার সাথে ঢালাও চাঁদাবাজির কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না।

আজকের যুগে একজন তথাকথিত ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ বা কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের প্রভাব প্রথাগত অনেক গণমাধ্যমের চেয়ে নিছক কম নয় বরং বেশি। তরুণ প্রজন্মের কাছে তাঁদের একটি একক লাইভ বা ভিডিও বিশাল বার্তা পৌঁছে দেয়। লক্ষ লক্ষ অনুসারী যাঁদের বক্তব্য শোনে, তাঁদের কাঁধে দায়িত্বের বোঝা সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি হওয়া উচিত। যখন এরপর একজন ব্যক্তি লাইভে এসে বলেন, ‘অমুক দলের লোক চাঁদা চেয়েছে’, তখন সেটি কেবল একটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা আক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মুহূর্তের মধ্যে সেটি লাখ লাখ মানুষের কাছে রাজনৈতিক সত্য বা ন্যারেটিভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে যখন মূল তথ্য উন্মোচিত হয় এবং দেখা যায়, ঘটনাটি জমির দখল-সংক্রান্ত বিরোধ, ততক্ষণে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি হওয়ার কথা, তা হয়ে যায়। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সময়োপযোগীভাবে উল্লেখ করেছেন- অনলাইন মাধ্যমে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে। তাৎক্ষণিক আবেগ বা অনুভূতির বশবর্তী হয়ে যাচাই ছাড়া কথা বললে তা সমাজে মারাত্মক ‘মিসইনফরমেশন’ বা অপতথ্য ছড়ায়।

গণমাধ্যমের ইতিহাসে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ বা ‘স্পেকুলেটিভ রিপোর্টিং’-এর বিরুদ্ধে সব সময় সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এখন নতুন যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা হলো ‘ইনস্ট্যান্ট জাজমেন্ট’ বা তাৎক্ষণিক বিচারক সেজে যাওয়া। আমাদের মনে রাখতে হবে, ‘কথা মুখ থেকে বের হলে আর ফেরানো যায় না, ধনুক থেকে তীর ছুটলে আর আটকানো যায় না’। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ধারণা পরবর্তীকালে সংশোধন করলেও সমাজে যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, তার দায় কে নেবে? বর্তমান ডিজিটাল যুগে কেবল কন্টেন্ট তৈরি করলেই চলে না, বরং সেই কন্টেন্টের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও আইনি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও স্পষ্ট জ্ঞান থাকা আবশ্যক। একেই বলা হয়, সাইবার লিটারেসি বা ডিজিটাল মাধ্যমের সচেতনতা। একজন ব্যক্তি যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হন, তখন আইনের আশ্রয় নেওয়া ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করাই প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হওয়া উচিত। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সহানুভূতি বা ‘ভাইরাল’ হওয়ার তাড়নায় যখন আদালতের রায়ের আগেই ব্যক্তি বা দলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তখন প্রকৃত বিচার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আমরা জানি ‘অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী, না জেনে বলা আরো ক্ষতিকারী’। তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে কেবল ব্যক্তি সালমান মুক্তাদির নন, সমাজের আরো বহু মানুষ এই ধরনের অপতথ্যে গা ভাসিয়ে দিতে পারেন। যার শিকার কেবল যে বিএনপি হবে সেটা নয়, যে কোনো ব্যক্তি অপতথ্যের শিকার হয়ে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারেন। একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরকে বুঝতে হবে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বলা প্রতিটি শব্দ একটি স্থায়ী নথির মতো থেকে যায়, যা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই কোনো নির্দোষ ব্যক্তি বা সংগঠনের ওপর অন্যায় তকমা এঁটে দেওয়া সম্ভব। তাই জনপরিসরে কথা বলার আগে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের ওপর আস্থা রাখা সভ্য সমাজের অন্যতম শর্ত।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামাজচর্চায় বেশ কিছু দিন ধরে এক অদ্ভ‍ুত ও বিষাক্ত ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেই সত্য-মিথ্যা বা তদন্তের তোয়াক্কা না করে বিরোধী বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে ঢালাওভাবে দায়ী করার এক অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এটি যেন এক ধরনের ‘সিস্টেমিক ব্লেম গেম’। যেমনটি এই ঘটনায় দেখা গেল- তদন্ত শুরুর আগেই উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এনসিপির নেতারা সরকারের তথা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নামে ‘প্রতীকী ভিক্ষার বাক্স’ খুলে চাঁদাবাজির ভিত্তিহীন তকমা সেঁটে দেওয়ার এক রাজনৈতিক নাটক রচনার চেষ্টা করা হলো। অথচ পুলিশের ডিবি শাখা কর্তৃক তদন্তে যখন নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলার এই ঘটনায় পরবর্তীকালে পুলিশ যে ছয় জনকে গ্রেপ্তার করেছে, তাদের মধ্যে শাহ আলম অনিক ‘মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক’।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin