মেট্রোরেলে যাত্রী ও আয় বাড়লেও সামনে বড় ঋণের কিস্তির চাপ
- আপডেট সময় : ০২:৩৯:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

ঢাকার গণপরিবহনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম মেট্রোরেলে যাত্রীসংখ্যা ও আয় ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এর পাশাপাশি বাড়ছে পরিচালন ব্যয় এবং বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের বড় চাপ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচলের সময় বাড়ানোর পাশাপাশি টিকিটের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকে আয় বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
ডিএমটিসিএলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত মেট্রোরেলে মোট ৩১ কোটি ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩০৬ জন যাত্রী যাতায়াত করেছেন। চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৭৫৬ জন যাত্রী যাতায়াত করেন, যা এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ যাত্রী পরিবহনের রেকর্ড। এছাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষ এই রেলে যাতায়াত করছেন, যা প্রকল্পটির প্রাথমিক প্রাক্কলিত দৈনিক ৫ লাখ যাত্রী ধারণক্ষমতার কাছাকাছি। মতিঝিল স্টেশন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানামা করা স্টেশন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫১ হাজার ৫৪২ জন যাত্রী প্রবেশ করেন এবং ৫১ হাজার ৩৬… জন বের হন। এছাড়া উত্তরা উত্তর, পল্লবী, মিরপুর-১০, কারওয়ান বাজার ও সচিবালয় স্টেশনেও যাত্রীদের ভিড় বেশি থাকে। অন্যদিকে উত্তরা দক্ষিণ, বিজয় সরণি ও উত্তরা সেন্ট্রাল স্টেশনে যাত্রী তুলনামূলক কম।
যাত্রী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেট্রোরেলের টিকিট বিক্রি থেকে আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের আংশিক চালুর সময়ে আয় হয়েছিল ২২ কোটি টাকার বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৪৪ কোটি টাকায়। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনিরীক্ষিত আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। তবে এই আয়ের বিপরীতে সামনে বড় অঙ্কের ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা, যার প্রায় ৫৯ শতাংশ জাইকার ঋণ। জাইকার কাছ থেকে পাঁচটি ঋণচুক্তির মাধ্যমে নেওয়া ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা আগামী ৩০ বছরে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত আগামী পাঁচ বছরে ৩ হাজার টেনশো কোটি টাকার (৩,৭০০ কোটি টাকা) বেশি কিস্তি পরিশোধ করতে হবে, যা গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৭৪০ কোটি টাকা।
একই সময়ে মেট্রোরেল পুরোনো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে। গত অর্থবছরে বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে ১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতির দেখভালের বড় অংশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হলেও, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এই দায়িত্ব ডিএমটিসিএলের ওপর পড়েছে, যার ফলে পরিচালন ব্যয় আরও বাড়বে।
এই পরিস্থিতিতে মেট্রোরেলের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মেট্রোরেলের আয় বাড়াতে হলে ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচলের সময় বাড়াতে হবে। ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল পথে এই মেট্রোরেলটি তৈরি করা হয়েছে এবং চালুর তিন বছর পর এর পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা উচিত। তিনি রাতে ও বন্ধের দিনেও মেট্রো চলাচল বাড়ানোর পাশাপাশি অযৌক্তিক খরচ কমানোর পরামর্শ দেন।
ডিএমটিসিএলের পরিচালক (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) মো. নজরুল ইসলাম জানান, প্রয়োজনীয় লোকবল পাওয়া গেছে এবং এখন পর্যায়ক্রমে রাতে মেট্রোরেলের চলাচল বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে দুই ট্রেনের মাঝখানের বিরতির সময়ও কমিয়ে আনা হবে। বর্তমানে সাড়ে তিন মিনিট পরপর ট্রেন চালানোর সক্ষমতা থাকলেও লোকবল সংকটের কারণে তা পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছিল না। কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, ট্রেনের সংখ্যা ও চলাচলের সময় বাড়িয়ে টিকিট বিক্রি থেকে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। এছাড়া কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোর সম্প্রসারণ কাজ শেষ হলে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে পৌঁছাবে এবং দেশের রেলব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হওয়ায় আয় আরও বাড়বে।
টিকিটের বাইরে আয় বাড়াতে স্টেশনের অব্যবহৃত জায়গায় দোকান বরাদ্দ দেওয়া, গাড়ি পার্কিং এবং বাণিজ্যিক জায়গা ব্যবহারের পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশে এবং ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর থেকে এটি ঢাকার মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। দিয়াবাড়ীর বাসিন্দা ও ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের টেকনোলজিস্ট কামাল হোসেন জানান, প্রতিদিন সকালে সহজেই আধা ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে পৌঁছে যান তিনি, তবে মাঝখানের স্টেশনগুলো থেকে যাত্রীদের বেশ গাদাগাদি করে যাতায়াত করতে হয়।
যেমন ১৩ সেপ্টেম্বর ৪ লাখ ৮০ হাজার ৬২০, ২০ আগস্ট ৪ লাখ ৭৮ হাজার ২৮০, ১৪ সেপ্টেম্বর ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮১৫ এবং ২১ মে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৩৫ জন যাত্রী হয়েছিল।
এখন সেই বাড়তি যাত্রীর মাধ্যমে আয় কতটা বাড়ানো যায় এবং একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় ও ঋণের কিস্তি কীভাবে সামাল দেওয়া যায়, সেটিই হবে মেট্রোরেল পরিচালনার পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।.২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল-মনোরেল নয়, আধুনিক ৭০০ বাসেই ভরসা.ঢাকায় আরও দুই রুটে মেট্রোরেল, ব্যয় দুই লাখ কোটি টাকার বেশি

























