অগ্রগতি ও কিছু প্রশ্ন রেখেই শেষ হলো নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলন
- আপডেট সময় : ১২:৩৬:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

এশিয়ার তিন পরাশক্তি ভারত, চীন ও রাশিয়ার শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে শেষ হলো ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি,চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আঞ্চলিক সহযোগিতা, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারত ও চীন পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় এবং বিশ্ব রাজনীতির চলমান পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই তিন নেতার সম্মিলনের ওপরই সবার নজর ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও অগ্রগতির মাঝেও কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখেই শেষ হয়েছে এবারের সম্মেলন।
সম্মেলনের প্রথম দিন㳡নিবার রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আয়োজিত নৈশভোজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহামেদসহ কয়েকজন নেতা অংশ নেননি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, শনিবার বিকেলে দিল্লিতে পৌঁছানোর পর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং সে কারণেই তিনি নৈশভোজে যোগ দিতে পারেননি। তবে এই যুক্তি নিয়ে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, শি জিনপিং ছাড়াও অন্য যেসব নেতা নৈশভোজে অনুপস্থিত ছিলেন, তাদের বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অবশ্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতা এবং ভারতের কয়েকজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের সমাপনী দিনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গ্লোবাল সাউথ ও উদীয়মান বাজারের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। এ সময় তিনি পাঁচ দফার একটি সহযোগিতা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন। এর মধ্যে রয়েছে ১. উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উদ্যোগ, ২. বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণ উদ্যোগ, ৩. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রতিভা উন্নয়ন উদ্যোগ এবং ৪. বুদ্ধিমান উৎপাদন বা স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে সহযোগিতা উদ্যোগ ও অন্যান্য পরিকল্পনা। শি জিনপিং জানান, চীন ব্রিকস এআই ওপেন সোর্স কমিউনিটি গঠনে নেতৃত্ব দেবে এবং লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরিতে সহায়তা করবে। এছাড়া একটি সমন্বিত স্মার্ট পোর্টাল চালু করতে ব্রিকস বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল অংশীদারিত্ব এবং যৌথ ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ব্রিকস ডিজিটাল ইকোসিস্টেম ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও করেন তিনি।
এদিকে সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাতটি দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এর মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই নেতাই একমত হয়েছেন যে পারস্পরিক মতপার্থক্য যেন বিরোধে রূপ না নেয়। ২০২৫ সালের আগস্টে তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর থেকে ভারত-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে অগ্রগতি হয়েছে, তাকে দুই নেতাই স্বাগত জানিয়েছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর বক্তব্যে ব্রিকসের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, স্বাধীন পথ অনুসরণ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান খোঁজার নীতিই বিশ্বকে ব্রিকসের প্রতি আকৃষ্ট করছে। পুতিন ব্রিকসের নিজস্ব পেমেন্ট, ডিপোজিটরি ও ক্লিয়ারিং অবকাঠামো তৈরি, একটি পুনর্বীমা ব্যবস্থা এবং জোটের অধীনে শস্যবাজার বা গ্রেইন এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। ১১টি সদস্য দেশ এবং ১০টি পার্টনার দেশকে নিয়ে এই সম্মেলন। এদিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কাছে আত্মসমর্পণ করবে না ইরান।
১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই দুই দিনের সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রতিনিধি অংশ নেননি। আমন্ত্রণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বা তাঁর কোনো প্রতিনিধি এই সম্মেলনে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তবে পুরো সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা বা বিষয় উত্থাপিত হয়নি।
সম্মেলনের প্রথম দিনেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সর্বসম্মতভাবে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গৃহীত হয়। এতে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বহুপাক্ষিক কূটনীতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ ব্রিকস জোটে ইরানের পাশাপাশি মার্কিন মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতও রয়েছে। এ ছাড়া, বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন একতরফা শুল্ক ও অশুল্ক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা মূলত রাশিয়া ও ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রতি ইঙ্গিত করে।
ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে গঠিত এই জোটটি এখন অনেক পরিপক্ব বলে মন্তব্য করেছেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, বিশ্বমঞ্চে ব্রিকসের ঐক্যকে এখন বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও ডব্লিউটিও-র মতো পশ্চিমা প্রভাবাধীন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি জানিয়ে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে ব্রিকস।
























