লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের বিদায়, মোতায়েন হতে পারে ইউরোপীয় বাহিনী
- আপডেট সময় : ০২:০৪:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

দক্ষিণ লেবাননে নিয়োজিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর (ইউএনআইএফআইএল) ম্যান্ডেটের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই ম্যান্ডেট শেষ হওয়ার পর বাহিনীটির প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই পরিস্থিতিতে সেখানে সম্ভাব্য নিরাপত্তাশূন্যতা এড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি নতুন মিশন গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।
ইইউর কূটনৈতিক সংস্থা ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস (ইইএএস) মূলত তিন বছর মেয়াদি একটি সামরিক ও বেসামরিক মিশনের প্রস্তাব দিয়েছে। এই মিশনের মূল লক্ষ্য হবে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী (এলএএফ) ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে (আইএসএফ) পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া। পাশাপাশি সীমান্ত ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করাও এর আওতায় থাকবে। তবে ইইউ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ইউএনআইএফআইএলকে সরাসরি প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
লেবাননে বর্তমানে প্রায় প্রতিদিনই ইসরাইলি হামলা চলছে এবং দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড ইসরাইলের দখলে রয়েছে। এছাড়া প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আয়ারল্যান্ডে চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় ইইউর প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে লেবানন ইস্যুটি গুরুত্ব পেতে পারে। এর আগে গত মে মাসে ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস জানিয়েছিলেন, লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তা করতে ইউরোপীয়রা একটি মিশন গঠনে প্রস্তুত। তবে ইউএনআইএফআইএলের পুরো দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।
১৯৭৮ সালের ১৯ মার্চ দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের হামলার পর ইউএনআইএফআইএল গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর যুদ্ধের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে এর দায়িত্ব আরও বাড়ানো হয়। এই বাহিনীকে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ এবং দক্ষিণ লেবাননে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর মোতায়েনে সহায়তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে বাহিনীটির ক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। তারা কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রতিবেদন তৈরি ও সহযোগিতা করতে পারত; কিন্তু ইসরাইলকে প্রত্যাহারে বাধ্য করা বা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। ইসরাইলের অভিযোগ ছিল, ইউএনআইএফআইএল সীমান্তে হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে বাহিনীটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চাপ বাড়তে থাকে।
ইউনিভার্সিটি অব গ্যালওয়ের আইরিশ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের অধ্যাপক ও সাবেক ইউএনআইএফআইএল সদস্য রেমন্ড মারফি মনে করেন, নতুন ইউরোপীয় বাহিনীকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিত করা বা হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা কম। তাদের মূল কাজ হতে পারে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। তবে নিজেদের সুরক্ষার জন্য তাদের যথেষ্ট সামরিক সক্ষমতা ও অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা থাকতে হবে।
অবশ্য ইউরোপীয় মিশনই একমাত্র বিকল্প নয়। ইউএনআইএফআইএলের পরবর্তী ব্যবস্থা নিয়ে জাতিসংঘও পরিকল্পনা করছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত জুনে নিরাপত্তা পরিষদের সামনে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দেন, যেখানে ৯০০ থেকে ৩ হাজার সেনা রাখার কথা বলা হয়েছে। অথচ গত জুনেও ইউএনআইএফআইএলে প্রায় ৭ হাজার সেনা নিয়োজিত ছিল।
লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমাদ সালামেয়ি আল জাজিরাকে বলেন, ইউএনআইএফআইএল চলে যাওয়ার পর সাময়িক নিরাপত্তাশূন্যতা তৈরির ঝুঁকি ‘বেশ গুরুতর’। এতে ইসরাইল বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। আন্তর্জাতিক কোনো বাহিনী না থাকলে ইসরাইল এমন একটি ব্যবস্থা চাইতে পারে, যেখানে লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে আরও সরাসরি সমন্বয় করতে হবে, আর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি সতর্ক করেন যে, এই বিকল্প ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নিলে পরে নতুন কোনো শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা কঠিন হবে।
এদিকে, ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও সমালোচকদের মতে তা ইসরাইলের হামলা বন্ধে কার্যকর হয়নি। জুনের শেষ দিকে দুই পক্ষ একটি 'পাইলট জোন' তৈরিতে সম্মত হয়েছিল, যেখান থেকে ইসরাইলি বাহিনী সরে যাবে এবং লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে। তবে আগস্টের শুরুতে রোমে এ নিয়ে আলোচনা হলেও পাইলট জোন সম্প্রসারণের বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য ইউরোপীয় মিশনের সাফল্য কেবল বাহিনীর ওপর নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করবে। সালামেয়ির মতে, দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া কোনো বাহিনী মোতায়েন করা হলে তা ইউএনআইএফআইএলের মতোই সীমাবদ্ধতার মুখে পড়বে। ইসরাইল যদি লেবাননে অভিযান ও সেনা উপস্থিতি বজায় রাখে এবং হিজবুল্লাহ যদি এই কাঠামো প্রত্যাখ্যান করে, তবে ইউরোপীয় বাহিনীর নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। পারস্পরিক অঙ্গীকার ও বাস্তবসম্মত প্রয়োগব্যবস্থা ছাড়া ইউএনআইএফআইএলের বদলে ইউরোপীয় মিশন আনা হলে কেবল নাম বদলাবে, কিন্তু পুরোনো সমস্যাগুলোই বহাল থাকবে।




























