পৌর চেয়ারম্যান থেকে বঙ্গভবন: মির্জা ফখরুলের চার দশকের রাজনৈতিক যাত্রা
- আপডেট সময় : ১১:২৪:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

তৃণমূলের রাজনীতি থেকে উঠে এসে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ অলঙ্কৃত করতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০২৬ সালের ২০ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে পরাজিত করে তিনি বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা এই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিরোধী জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। সংসদে বিএনপির বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তার এই বিজয় ছিল অনেকটাই প্রত্যাশিত।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির মধ্য দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে তার পেশাগত জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারী এ টি-র ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন ফখরুল। তবে শিক্ষকতা বা সরকারি চাকরির নিরাপদ জীবন তাকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।
সক্রিয় রাজনীতিতে নামার মাত্র দুই বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনে প্রথম বড় সাফল্য আসে। তৎকালীন স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমলে কোনো জাতীয় রাজনৈতিক দলের টিকিট ছাড়া, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াই করে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় সরকারের এই দায়িত্ব তাকে সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যায় এবং তৃণমূলের রাজনীতিতে তার ভিত মজবুত করে। পরবর্তীতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মনোনীত হন।
জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে প্রথম দিকে মির্জা ফখরুলের পথ মসৃণ ছিল না। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন। তবে এই পরাজয় তাকে থামিয়া দিতে পারেনি। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০০১ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। এর মাধ্যমে তৃণমূলের পৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে তার অভিষেক ঘটে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে পুনরায় পরাজিত হলেও দলের ভেতর তার গুরুত্ব ও অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে থাকে। ২০০৯ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের পর তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন। ২০১১ সালে দলের তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর এই দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপরের সময়গুলো ছিল বিএনপির জন্য অত্যন্ত সংকটের। মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে দলকে সুসংগঠিত রাখতে মির্জা ফখরুলকে অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়েছে।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ব্যবধানে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে চার দশকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়ে তিনি বঙ্গভবনের বাসিন্দা হতে যাচ্ছেন। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা নানা চড়াই-উতরাই, পরাজয়, দল গঠন ও নেতৃত্বের কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অবশেষে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে গিয়ে পৌঁছেছে।




























