সিলেটে বাস দুর্ঘটনায় বাউলশিল্পী পেহেলি ভৈরবীসহ নিহত ৯
- আপডেট সময় : ০৬:৩৮:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে

সিলেটের ওসমানীনগরে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন উদীয়মান বাউল ও লোকশিল্পী পেহেলি ভৈরবী (২০)। শুক্রবার সকালে ঘটা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পেহেলিসহ মোট নয়জন নিহত হয়েছেন। গান গেয়ে শ্রোতাদের মাতাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে সিলেটে এলেও শেষ পর্যন্ত জীবিত বাড়ি ফেরা হলো না এই তরুণ শিল্পীর। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে নিজ এলাকা ভৈরবের চণ্ডীবের উত্তরপাড়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পেহেলি ভৈরবীর প্রকৃত নাম ইসরাত জাহান। তবে গানপাগল মানুষ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে তিনি পেহেলি ভৈরবী নামেই পরিচিত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর পেজে অনুসারীর সংখ্যা প্রায় অর্ধলক্ষাধিক। ছোটবেলা থেকেই মায়ের অনুপ্রেরণায় গান গাওয়া শুরু করা পেহেলি গত পাঁচ বছর ধরে মঞ্চে নিয়মিত গান গাইতেন। বাউল ও লোকসংগীতের মাধ্যমে সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার অঞ্চলে তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। ইউটিউবে তাঁর একাধিক গানের ভিউ ১০ লাখ ছাড়িয়েছে এবং ১০টি গান নিয়ে তাঁর একটি একক অ্যালবামও প্রকাশিত হয়েছিল।
নিহত পেহেলির মা রোজিনা বেগমও একজন সংগীতশিল্পী এবং মেয়ের প্রথম গানের শিক্ষক। মেয়ের মরদেহের পাশে বসে বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘এত তাড়াতাড়ি কেমনে চইল্লা গেলি। আমার কী হইব? আমি কারে নিয়া থাকুম। কে আমারে গান শোনাইব।’ তিনি জানান, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত একটার দিকেও মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল, কিন্তু সকালে এমন বিপর্যয় ঘটবে তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।
পেশায় ঠিকাদার বাবা বাবুল মিয়ার এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে পেহেলি ছিলেন ছোট। সাধারণত মা কিংবা বাবার সঙ্গেই তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতেন। এবারও তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন বাবা বাবুল মিয়া। দুর্ঘটনায় তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে পেহেলির মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাঁর সহশিল্পী উবায়দুল কাওয়াল দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘পেহেলির গানের ধারা এক, আমারটা আরেক। ওর জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখে ভালো লাগতো। এত অল্প বয়সে একজন বাউলশিল্পীর চলে যাওয়া মানে মনের গান গাওয়ার একজন মানুষ কমে যাওয়া।’ ফেসবুকেও তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
একই সড়ক দুর্ঘটনায় কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম (৫৫) নামের আরেকজন মারা গেছেন। পেশায় ঠিকাদার সাইফুল কুলিয়ারচর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। গত বুধবার চার বন্ধু ফারুকুল ইসলাম, জমরুত মিয়া, মো. রানা ও আবদুল লতিফকে সঙ্গে নিয়ে সিলেট ভ্রমণে গিয়েছিলেন তিনি। দুর্ঘটনায় ফারুকুল ও আবদুল লতিফ আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। ফারুকুল ইসলাম উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক।
আহত বন্ধু আবদুল লতিফ দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে জানান, শুক্রবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সিলেট থেকে ছাড়ে। বাসে ওঠার পরপরই তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঘুম ভাঙার পর তিনি নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় আবিষ্কার করেন এবং জানতে পারেন যে তাঁর বন্ধু সাইফুল আর বেঁচে নেই। সাইফুলের মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছালে কুলিয়ারচরেও গভীর শোকের পরিবেশ তৈরি হয়।
উদীয়মান এই শিল্পীর মৃত্যুতে এলাকায় শোক নেমে এসেছে।.বিকেল ৫টা ৪ মিনিটের দিকে পেহেলি ভৈরবীর মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়ির সড়কে এসে থামে।

























