জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক: নিরাপত্তার শঙ্কায় ডিবিকে দেয়া হয়নি ডিভাইস
- আপডেট সময় : ০৭:২৯:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর আট মাসের বেশি সময় পার হলেও তদন্ত প্রক্রিয়ায় গতি আসেনি। ঘটনার তদন্তের স্বার্থে জামায়াত আমিরের ব্যবহৃত মুঠোফোনসহ সংশ্লিষ্ট ডিভাইসগুলো চেয়ে বাদীপক্ষকে অন্তত তিনবার আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম-দক্ষিণ ইউনিট। আদালতের অনুমতি নিয়ে এসব চিঠি দেওয়া হলেও তদন্তকারী সংস্থার কাছে এখনো এসব ডিভাইস হস্তান্তর করেনি বাদীপক্ষ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, হ্যাকিংয়ের মতো প্রযুক্তিগত অভিযোগের সত্যতা ও রহস্য উন্মোচনে আক্রান্ত ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। ডিভাইস বিশ্লেষণ করলে কখন, কীভাবে এবং কোন স্থান থেকে অ্যাকাউন্টে অননুমোদিত প্রবেশ ঘটেছিল, সে সম্পর্কিত লগইন তথ্য, সেশন ডেটা কিংবা কোনো ক্ষতিকর ম্যালওয়্যার বা ফিশিং লিঙ্কের আলামত পাওয়া সম্ভব হয়। জামায়াত আমিরের ডিভাইস না পাওয়ার কারণে তদন্তের বেশ কয়েকটি মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মিলছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হাফিজুল ইসলাম জানান, আদালতের থেকে অনুমোদন নিয়ে বাদীপক্ষের কাছে অন্তত তিনবার চিঠি ও তথ্য চাওয়া হয়েছে, কিন্তু বাদীপক্ষ এখনো ডিভাইস জমা দেয়নি। তবে আদালত কবে ফরেনসিক পরীক্ষার আদেশ দিয়েছেন বা বাদীকে সর্বশেষ কোন তারিখে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানাননি তিনি। নথিপত্র অনুযায়ী, গত ৬ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের ভিত্তিতে আদালত ডিভাইস জব্দ ও ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি দেন। বর্তমানে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের জন্য আগামী ৩ নভেম্বর দিন ধার্য রয়েছে।
ডিভাইস না দেওয়ার বিষয়ে জামায়াত আমিরের পক্ষে মামলার বাদী মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, তারা তথ্য ও ডিভাইস দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন না, তবে ডিভাইসের সার্বিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে তাদের মনে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে তারা ইতোমধ্যে ডিবির সঙ্গে দুই দফায় বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম বলেন, ডিবির চিঠির জবাবে তারা দেখা করেছেন এবং ডিভাইস দিতে আপত্তি না থাকলেও সেটির নিরাপত্তা সুরক্ষা তাদের চিন্তার প্রধান কারণ। তাদের উপস্থিতিতেই যেন ডিভাইস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মামলা দায়েরের সময়ই গবেষণালব্ধ কিছু নথি ও তথ্য পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল জানিয়ে বাদী উল্লেখ করেন, সরকারের সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কোনো স্থান থেকে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে তারা ওই নথিতে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে, বাদীপক্ষের মোবাইল ও ডিভাইস না পেলেও মামলার অন্যতম প্রধান আসামি বঙ্গভবনের (রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) বরখাস্তকৃত সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমের ব্যবহৃত মুঠোফোন, ল্যাপটপ এবং ডেক্সটপ জব্দ করে তল্লাশি চালিয়েছে ডিবি। ছরওয়ারের দাবি অনুযায়ী, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত কিছু ডিভাইসও ডিবি জব্দ করেছিল, যা প্রায় এক মাস তল্লাশির পর ফেরত দেওয়া হয়। তবে এসব জব্দ করা প্রযুক্তি থেকে কোনো আলামত উদ্ধার হয়েছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে চাননি তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি জানান, ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো হাতে আসেনি এবং মামলার শুরুর দিকে এক্স কর্তৃপক্ষের কাছে যে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছিল, সেখান থেকেও কোনো আপডেট মেলেনি। এসব প্রতিবেদন আসার পরেই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাবে।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্ত থাকা আসামি ছরওয়ারে আলম প্রথম থেকেই নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আসছেন। তিনি বলেন, শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো যোগসূত্র নেই এবং পুলিশ তাঁর ডিভাইস পরীক্ষা করেও জড়িত থাকার কোনো তথ্যপ্রমাণ বের করতে পারেনি। ছরওয়ারে আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জামায়াত নেতাদের কাছে বারবার মোবাইল চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও তারা তা দিচ্ছে না। তারা ডিভাইস জমা দিলে এত দিনে এই জটিলতার অবসান ঘটত। তিনি আরও বলেন, তারা বিরোধীদলীয় প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় তারা তদন্তে সাহায্য না করলে ঘটনাটি এভাবেই ঝুলন্ত থাকবে। নিজের চাকরিজীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি জানান, সাময়িক বরখাস্ত থাকায় তিনি কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না এবং চাকরির মেয়াদ আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকায় পেনশনসহ আর্থিক সুবিধা হারানোর হুমকিতে পড়েছেন, যা তাঁকে এক ধরনের 'বলির পাঁঠা' বানানোর শামিল।
পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট শুরু হয় গত ৩১ জানুয়ারি বিকেলে, যখন জামায়াত আমিরের এক্স হ্যান্ডল থেকে ইংরেজিতে একটি বিতর্কিত বক্তব্য পোস্ট করা হয়। ওই পোস্টে দাবি করা হয়েছিল, নারীদের আধুনিকতার নামে গৃহের বাইরে আনা হলে তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন, যাকে পতিতা বৃত্তির একটি ভিন্ন রূপ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেতেই রাজপথে প্রতিবাদ মিছিল ও ব্যপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিএনপি সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন অভিযোগ তোলে, জামায়াত আমির কর্মজীবী নারীদের চরম অবমাননা করেছেন।
সমালোচনার মুখে জামায়াত দ্রুতই দাবি করে, তাদের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে এবং একটি সরকারি ইমেইল ঠিকানা ব্যবহার করে ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার শুরুতে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরবর্তীতে মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার ছরওয়ারে আলমসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হলে গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ছরওয়ারকে আটক করে ডিবি। পরদিন তাঁকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখালেও একই দিনে আদালত থেকে জামিন পান তিনি।
তদন্ত কার্যক্রমে আলামত না পাওয়ার এই পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জানান, ন্যায়বিচারের স্বার্থে তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করা বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষেরই আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন মিছে মামলার মাধ্যমে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে সবার নজর দেওয়া উচিত। এক্স অ্যাকাউন্টে সত্যি কোনো অননুমোদিত প্রবেশ ছিল কি না, থাকলে তা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং এতে ছরওয়ারে আলমের কোনো ভূমিকা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের মীমাংসা এখনো ঝুলন্ত রয়ে গেছে।



























