জরুরি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতে জাতীয় রোডম্যাপ ও বাফার স্টক করছে সরকার
- আপডেট সময় : ০৬:০১:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে সুরক্ষিত রাখতে এবং প্রধান ওষুধগুলোর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে একটি জাতীয় রোডম্যাপ তৈরি করছে সরকার। একই সঙ্গে জরুরি ওষুধগুলোর ন্যূনতম বাফার স্টক বা মজুত নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) অধীনে এই বাফার স্টক সংক্রান্ত কাঠামোর একটি খসড়া প্রস্তুত করা হবে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশের বর্ধিত চাহিদা পূরণে সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে এই পরিকল্পনা বেশ কার্যকর হবে।
বৈঠকে ওষুধ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে উঠে আসে যে দেশীয় প্রস্তুতকারকরা স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ মেটাতে সক্ষম হলেও মূল কাঁচামাল ও অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টসের (এপিআই) ৯০ শতাংশেরও বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই আমদানিনির্ভরতা দূর করতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া এপিআই শিল্প পার্কটি দ্রুত পুরোদমে চালু করার কৌশল হাতে নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বর্তমান রোগের ধরন ও আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির আলোকেই দেশের এসেনশিয়াল মেডিসিনস লিস্ট বা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকীকে প্রধান এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) মহাপরিচালককে সদস্য সচিব করে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতের বিশ্বমানের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল বেঞ্চমার্কিং টুলের অধীন ম্যাচুরিটি লেভেল ৩ (এমএল-৩) অর্জনের বিষয়গুলো সভায় পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ডিজি মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন জানান, এমএল-৩ অর্জনের ২১১টি সাব-ইন্ডিকেটরের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৮৭টি পূরণ হয়েছে। বাকি লক্ষ্য অর্জনে জরুরিভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি ডিজিএইচএসের অধীনে 'ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি মেডিসিন সাপ্লাই কনটিনজেন্সি প্লান' প্রণয়ন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত টাস্কফোর্সের আদলে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ চৌধুরী পরামর্শ দেন, স্থানীয় কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে এপিআই খাত দ্রুত সক্রিয় করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং সেন্ট্রাল মেডিসিন ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
শিল্প খাতের দুর্বলতা তুলে ধরে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপী) সভাপতি আব্দুল মুক্তadir জানান, দেশে ওষুধের শক্তিশালী প্রস্তুত প্রণালী থাকলেও কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা খাতটিকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এই ঝুঁকি কমাতে তিনি ২০ থেকে ৩০টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এপিআই চিহ্নিত করে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করেন এবং নতুন কমিটিতে বাপীর প্রতিনিধি রাখার অনুরোধ জানান। এছাড়া গজারিয়া এপিআই পার্কে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে নিজস্ব গ্যাসে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়েট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাইমা) তথ্যানুসারে, প্রতি বছর কাঁচামাল আমদানিতে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট ও কাঁচামালের দরপতন থেকেও দেশীয় বাজার সুরক্ষিত থাকবে, যা পরবর্তীতে ভারত ও চীনের মতো রপ্তানিমুখী খাতে উন্নীত হতে পারে।
কাঁচামালের চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দেশীয় ওষুধ খাতের বৈশ্বিক পদচারণা দিন দিন বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০১০-১১ অর্থবছরে যেখানে ওষুধ রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র চার কোটি ৪২ লাখ ডলার, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা সাড়ে পাঁচ গুণ বেড়ে ২৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বাপী ও বাইমা নেতৃবৃন্দের মতে, কাঁচামাল তৈরিতে সরকারি নীতিগত পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে শিক্ষিত তরুণদের জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং আন্তর্জাতিক মূল্য শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও মজবুত হবে। বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে ১৯৯৮ সালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ১১৭টি ওষুধের তালিকা করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে চলতি বছরের জানুয়ারি ও আগস্টের পর্যালোচনার ধারাবাহিকতায় বর্তমান চাহিদার আলোকে এই তালিকা আধুনিকায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি ওষুধ খাতের সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা দূর করতে সরকারের দ্রুত নীতিগত সহায়তা ও হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য ২০-৩০টি অত্যাবশ্যকীয় এপিআইয়ের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির প্রস্তাব দেন।

























