পাচার ও চুরি ঠেকাতে বন্য প্রাণীর দেহে মাইক্রোচিপ বসাবে বন বিভাগ
- আপডেট সময় : ০৩:৩৬:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে

গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে বিভিন্ন সময়ে বন্য প্রাণী পাচার ও চুরির ঘটনা ঠেকাতে অভিনব এক উদ্যোগ নিচ্ছে বন বিভাগ। পার্কের সংবেদনশীল ও দুর্লভ বন্য প্রাণীদের দেহে এবার মাইক্রোচিপ বসানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি পাচার হওয়া বন্য প্রাণী নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সব প্রাণীর ডিএনএ প্রোফাইলিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পার্ক কর্তৃপক্ষ। মূলত দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত নজরদারি এবং সীমানাদেয়াল অরক্ষিত থাকার সুযোগ নিয়ে বারবার চুরির ঘটনা ঘটায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বন্য প্রাণীর ডিএনএ প্রোফাইলিং হলো মানুষের ফরেনসিক ডিএনএ টেস্টের মতোই একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো প্রাণীর জেনেটিক ছাপ বা জিনগত পরিচয় সংগ্রহ করে রাখা হয়, যাতে পরবর্তীতে ওই প্রাণী বা তার রক্তের সম্পর্কযুক্ত অন্য কোনো প্রাণীকে বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করা যায়। অন্যদিকে, মাইক্রোচিপ হলো চালের দানার আকৃতির অত্যন্ত ছোট একটি ইলেকট্রনিক চিপ। এতে একটি মৌলিক নম্বর থাকে, যা স্ক্যানার বা শনাক্তকরণ যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা করে প্রাণীর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বন্য প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার পর উদ্ধার করা হলে তা সাফারি পার্কের কি না, তা নিয়ে প্রায়ই সংশয় তৈরি হয়। মাইক্রোচিপ বসানো হলে এই সংশয় দূর হবে এবং পাচার প্রতিরোধ সহজ হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি সাফারি পার্ক রয়েছে। এর একটি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এবং অন্যটি দেশের সবচেয়ে বড় গাজীপুর সাফারি পার্ক। গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৩ হাজার ৬৯০ একর জমি নিয়ে ২০১০ সালে এই পার্কের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে ৭৩ প্রজাতির ১ হাজার ৫০০ বন্য প্রাণী নিয়ে পার্কটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এই বিশাল পার্কটি পরিচালনার জন্য ৮৪ জন জনবল নিয়োজিত রয়েছে।
গাজীপুর সাফারি পার্কে বিগত সময়ে বেশ কিছু চুরির ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালের ২২ নভেম্বর পার্কের সাফারি কিংডম থেকে দুটি অত্যন্ত মূল্যবান গ্রিন উইং ম্যাকাও পাখি চুরি হয়। এই ঘটনায় একজনকে আটক এবং একটি পাখি উদ্ধার করা সম্ভব হলেও চুরির মূল রহস্য এখনো উদঘাটিত হয়নি। এরপর ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি পার্ক থেকে একটি নীলগাই হারিয়ে যায়, যার কোনো সন্ধান মেলেনি। একই বছরের মার্চে মাদাগাস্কারের অত্যন্ত দুর্লভ তিনটি রিং-টেইলড লেমুর চুরির ঘটনা ঘটে। সিআইডির তদন্তে উঠে আসে যে, লেমুরগুলো সীমান্ত পার করে ভারতে পাচার করা হয়েছে। এছাড়া পার্কটিতে ‘রাজু বাহাদুর’সহ দুটি হাতির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
বারবার এমন চুরির ঘটনার প্রেক্ষিতে বন্য প্রাণীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মাইক্রোচিপ বসানোর প্রস্তাব দিয়ে বন অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে চিঠি পাঠান পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক তারেক রহমান। ওই চিঠির গুরুত্ব বিবেচনা করে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শারমীন আক্তারও সহমত পোষণ করে বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষকের কাছে চিঠি পাঠান। এর এক বছর পর এখন মাইক্রোচিপের পাশাপাশি ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের সমন্বিত উদ্যোগ নিচ্ছে বন অধিদপ্তর।
বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী জানান, সংবেদনশীল ও দুর্লভ বন্য প্রাণীর ডিএনএ প্রোফাইলিং ও মাইক্রোচিপ বসানোর কাজটি করবে বন বিভাগের বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের ফরেনসিক ল্যাব। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের প্রধান বন সংরক্ষক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, দেশের দুটি সাফারি পার্কের প্রাণীদের দেহে মাইক্রোচিপ বসানো ও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের একটি প্রস্তাব তারা পেয়েছেন। কোন কোন প্রাণীর জন্য এটি প্রয়োজন, তা সুনির্দিষ্ট করে কাজ শুরু হবে। কিছু মাইক্রোচিপ ইতিমধ্যে বন বিভাগের হাতে রয়েছে, বাকিগুলো সংগ্রহ করা হবে। তবে ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ শনাক্তকরণের রাসায়নিক বা রিএজেন্টের কিছু ঘাটতি রয়েছে, যা এক মাসের মধ্যে চলে আসবে বলে তিনি জানান।
পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, সাড়ে তিন হাজার একরের বেশি আয়তনের এই বিশাল পার্কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বন্য প্রাণীর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যগত উপাত্ত পাওয়ার জন্য এই উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই সাফারি পার্কে দীর্ঘদিন কাজ করা বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও পার্কের অন্যান্য অব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, পার্কের খাঁচাগুলো অস্বাস্থ্যকর এবং আবদ্ধ অবস্থায় বন্য প্রাণীগুলো অস্বস্তিতে থাকে। এগুলো বোঝার মতো দক্ষ বা জ্ঞানসম্পন্ন জনবল পার্কে নেই। ৫০ দশকের পুরোনো পদ্ধতিতে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা চলছে উল্লেখ করে তিনি এই সনাতন ব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তন আনার তাগিদ দেন।

























