বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকাই এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি। তবে সামগ্রিক খাতের এমন চরম সংকটের মধ্যেও ব্যতিক্রমী অবস্থান ধরে রেখেছে ১৩টি বেসরকারি ব্যাংক। এসব ব্যাংকের প্রতিটিতে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, নিয়মতান্ত্রিক ও স্বাধীন ঋণ অনুমোদন, গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই এবং বড় করপোরেট ঋণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) ও ভোক্তা ঋণে গুরুত্ব দেওয়ায় খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনভিত্তিক সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৫ শতাংশের কম খেলাপি ঋণ থাকা এই ১৩টি ব্যাংকের সব কটিই বেসরকারি খাতের। এর মধ্যে নতুন প্রজন্মের ব্যাংকের পাশাপাশি প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকও রয়েছে। ব্যাংকগুলো হলো—কমিউনিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফাইন্যান্সিয়াল সাউন্ডনেস ইন্ডিকেটরস এবং বিশ্বব্যাংকের খেলাপি ঋণ সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশগুলোর একটি। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এমন পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু ব্যাংক করপোরেট সুশাসনের উত্তম চর্চা ধরে রেখেছে। এর ফলে এসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি যেমন মজবুত হয়েছে, তেমনি মুনাফা ও আমানত প্রবৃদ্ধিতেও তারা এগিয়ে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, শতকরা হারের দিক থেকে দেশে সবচেয়ে কম খেলাপি ঋণ রয়েছে নতুন প্রজন্মের কমিউনিটি ব্যাংকে। গত জুনের শেষে এই ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি মাত্র ৫ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ।
দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। গত জুন নাগাদ ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ৭৫ হাজার ৬২১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। ব্র্যাক ব্যাংক বর্তমানে দেশি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষ মুনাফা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সম্প্রতি মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের বিশ্বের সেরা পারফর্মিং ৫০০ ব্যাংকের তালিকায় স্থান পেয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সুশাসন ও সঠিক ঝুঁকি মূল্যায়নই ব্র্যাক ব্যাংকের ঋণের গুণগত মান ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি। কোনো অনৈতিক চাপ ছাড়া সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করে ঋণ দেওয়া হয়েছে বলেই খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
কম খেলাপি ঋণের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। গত জুনের শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ৭২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী জানান, এই ব্যাংকের কোনো ঋণ একক পরামর্শ বা ব্যক্তিগত সুপারিশে দেওয়া হয় না। সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক মূল্যায়নের মাধ্যমে এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে ঋণ দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, ব্যাংকের অধিকাংশ বড় ঋণই খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও পোশাকের মতো প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক খাতে দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে তারা ভোক্তা খাতে গুরুত্ব বাড়াচ্ছেন।
তালিকায় চতুর্থ স্থানে থাকা নতুন প্রজন্মের সিটিজেনস ব্যাংকে গত জুনের শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ। পঞ্চম অবস্থানে থাকা প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৪৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২ দশমিক ৭১ শতাংশ। ষষ্ঠ স্থানে থাকা সিটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন বলেন, স্বাধীন ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বৈচিত্র্যময় ঋণের কারণে খেলাপি ঋণের হার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে এসএমই ও ভোক্তা ঋণ তাদের বড় স্বস্তি দিচ্ছে। সপ্তম অবস্থানে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ।
পরবর্তী অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে যমুনা ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকে ৪ দশমিক শূন্য7 শতাংশ, এনসিসি ব্যাংকে ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংকে ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকে ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং সীমান্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
বিপরীতে, দেশের ব্যাংক খাতে গত জুনে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকেই খেলাপি ছিল ৪ লাখ ৩৯ confid৫২৬ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ। খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা (মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ)। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংকে, যার পরিমাণ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা (মোট ঋণের ৭৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ)।
খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
ব্যাংক খাতের এই সামগ্রিক চিত্র নিয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) সাবেক এমডি আনিস এ খান বলেন, ব্যাংক খাতের উচ্চ খেলাপির মধ্যেও যেসব ব্যাংক ভালো করছে, তারা করপোরেট সুশাসনের উত্তম চর্চা বজায় রেখেছে। এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও দক্ষ ব্যাংকারদের ভূমিকার কারণেই খেলাপি ঋণ কম এবং গ্রাহকেরা এখন টাকা রাখার ক্ষেত্রে এসব ব্যাংককেই বিবেচনায় নিচ্ছেন।
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থীর হাতে পরিমার্জিত বই তুলে দিতে ৩০…
সিরাজগঞ্জে ১৪ কোটি টাকা গ্যাস বিল বকেয়া থাকায় এম এ মতিন কটন মিলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন…
পাবনায় ধর্ষণ ও হত্যার শিকার চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলির নিখোঁজ দুই পায়ের সন্ধানে আবারও…
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর আলোচিত শিশু জুলিয়া আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আমীর হোসেন ওরফে…
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২’-এ…
ভোলার বোরহানউদ্দিনে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর মো. ইসমাঈল নামের ছয় বছর বয়সী এক শিশুর…
This website uses cookies.