হাতপাখায় আশ্রয় খুঁজছেন পুরনো দোসররা নারায়ণগঞ্জে ইসলামী আন্দোলনকে ঘিরে প্রশ্ন ও ক্ষোভ
- আপডেট সময় : ১২:০০:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২১ বার পড়া হয়েছে

আতাউর রহমান,
নারায়ণগঞ্জ, বন্দর উপজেলা প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা। দীর্ঘদিন ধরে ওসমান পরিবার ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় থাকা এসব নেতার হঠাৎ আদর্শিক রূপান্তর নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল ও তৃণমূল রাজনৈতিক কর্মীরা।
বিশেষ করে জাতীয় পার্টির সাবেক প্রভাবশালী নেতা গোলাম মসীহকে ঘিরে সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তথাকথিত বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ সহকারী হিসেবে পরিচিত গোলাম মসীহকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে সৌদি আরবে রাষ্ট্রদূত করা হয়েছিল।
এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের দলীয় কোন্দল উসকে দিয়ে জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে রাখতে তার ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে যেসব কুশীলব নেপথ্যে কাজ করেছেন, তাদের একজন হিসেবেও গোলাম মসীহের নাম উঠে আসে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুদিন নীরব থাকলেও সম্প্রতি তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে যোগ দিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তার যোগদানের পর নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও–সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে দলীয় প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়েছে, যা স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী আন্দোলনের একাধিক কর্মী জানান, আমাদের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ফারুক মুন্সীকে প্রার্থী ধরে কাজ চলছিল। হঠাৎ কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থী বদলে যায়। এটা তৃণমূলের মতামত নয়, কিন্তু বাধ্য হয়েই আমাদের মেনে নিতে হচ্ছে।
আরও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে গোলাম মসীহকে নিয়ে ওঠা ধর্মীয় অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে কাদিয়ানী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে, যা নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবির প্রেক্ষাপটে একটি ইসলামী দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার উপস্থিতি দলের আদর্শিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছে অনেকে।
এদিকে একই রকম গুঞ্জন রয়েছে বন্দর উপজেলার মুছাপুর এলাকার আলোচিত ব্যক্তি মাকসুদ হোসেনকে ঘিরে। ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই নেতা দীর্ঘদিন জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
স্থানীয়ভাবে ত্রাস হিসেবে পরিচিত মাকসুদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, দখল, হামলা ও লুটপাটের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সংঘটিত সহিংস ঘটনার পর যৌথবাহিনীর অভিযানে তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেন বলেও জানা যায়।
জেল থেকে মুক্তির পর মাকসুদ হোসেন ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন তথ্য ঘুরছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। যদিও তিনি সরাসরি তা অস্বীকার করেছেন, তবে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সোনারগাঁওয়ের জাতীয় নাগরিক পার্টির এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জাতীয় পার্টি ২০১৪ ও ২০১৮ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে বৈধতা দিয়ে ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রেখেছে। সেই দলের নেতারা যদি অনায়াসে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় দলগুলোতে ঢুকে পড়ে, তাহলে সেটা শহীদ ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে।
জেলা ও মহানগর পর্যায়ের ইসলামী আন্দোলনের নেতারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করলেও তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, বিতর্কিত ও অতীত-দায়যুক্ত ব্যক্তিদের আশ্রয় দিলে ইসলামী আন্দোলনের অর্জিত গ্রহণযোগ্যতা ও ইমেজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকার কারণে ইসলামী আন্দোলন যে আস্থা ও সম্মান অর্জন করেছে, তা ধরে রাখতে হলে আদর্শিক প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করলে চলবে না। অন্যথায়, হাতপাখা প্রতীক নিজেই বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।



















