উত্তাল ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরে কারফিউ ও তীব্র বিক্ষোভ
- আপডেট সময় : ০৩:২৬:৪৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে

দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি সেবার অবনতি এবং আবাসন সংকট ঘিরে ইউরোপের কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ চলছে। সবচেয়ে বেশি সহিংসতার পর ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের লিলসহ চারটি শহরে সোমবার রাত আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত এবং মঙ্গলবার রাত আটটা থেকে বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত আংশিক কারফিউ জারি করেছে সরকার। তবে রাজধানী প্যারিসজুড়ে কারফিউ জারির সম্ভাবনা নাকচ করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ঁ লেকর্নুর কার্যালয়। মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী জানান, জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে জরুরি অবস্থা জারি করা হতে পারে। এছাড়া মার্সেই শহরে দুপুর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং দেনাঁ শহরেও কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছিল।
গত শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি শুরু হলেও পরবর্তীতে তা সহিংস রূপ নেয়। সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ, দোকান ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। বাণিজ্য সংগঠনের হিসাবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে। শুধু প্যারিসেই তিন শ থেকে চার শ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। শনিবারের বিক্ষোভ থেকে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রায় এক হাজার নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন। পুলিশের একটি ভিড় নিয়ন্ত্রণকারী গ্রেনেডে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। সহিংসতা মোকাবিলায় প্রায় ৬০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁর মেয়ররা নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ পদত্যাগ করতে চাইলেও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তা গ্রহণ করেননি। রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানান এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন। নিজ দেশে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সোমবার তিন দিনের উপসাগরীয় সফর শুরু করেন মাখোঁ। এদিকে ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী আন ল্য হেনানফ অভিযোগ করেছেন, লুট হওয়া পণ্য অনলাইনে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। তিনি ভিনটেড, অ্যামাজন, ইবে, লেবনকোয়াঁ, মেটা ও টিকটকের প্রতিনিধিদের আলোচনায় ডেকেছেন। ভিনটেড জানিয়েছে তারা বিজ্ঞাপন সরাতে কাজ করছে, তবে ইবে এ বিষয়ে নিশ্চিত নয়।
ফ্রান্সে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শিক্ষকসংকট ও স্কুলের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়, পরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ অন্যরাও যোগ দেন। মার্চের পর দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং পেট্রলের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে। বিক্ষোভকারীরা প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরের প্রবেশপথ আটকে দেন। পর্যটকদের জন্য শহরটি এখন অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলন আগামী শনিবার আবার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
ইউরোপের অন্যান্য দেশেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইতালির মিলান, বোলোনিয়া, ব্রেশিয়া, বেরগামো ও তুরিনে শনিবার বিক্ষোভ হয়েছে। রোববার মিলানে মুখোশধারীরা রাস্তায় আগুন ধরান ও দোকানে লুটপাট চালান। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রোববার মিলানে ২৭১ জনকে থানায় নেওয়া হয়, যার মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। পর্তুগালের লিসবন ও পোর্তোতে বাড়িভাড়ার চাপ ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদে মানুষ তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন। সরকারি হিসাবে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। স্পেনের মাদ্রিদেও আবাসনসংকট নিয়ে বিক্ষোভ চলছে এবং প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ও লিয়েজ এবং আলবেনিয়ার তিরানাতেও বিক্ষোভ সহিংস হয়েছে। আলবেনিয়ায় বিক্ষোভকারীরা পেট্রলবোমা ছুড়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন। জার্মানি, ইতালি ও পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের নাগরিকদের বড় জমায়েত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।



























