১১ বছর ধরে বন্ধ এমআরআই, দিনাজপুর মেডিকেলে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা
- আপডেট সময় : ০৫:০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকট এবং দীর্ঘ ১১ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ এমআরআই (MRI) মেশিন বন্ধ থাকায় স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগীর চাপ থাকায় প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে এখানে ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। এছাড়া হাসপাতালের বহির্বিভাগেও প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন আরও প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ। শয্যা সংকটের কারণে অতিরিক্ত রোগীদের হাসপাতালের মেঝে, বারান্দা ও করিডোরে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে প্রথম শ্রেণির নার্সিংয়ের অনুমোদিত ৪টি পদের সব কটিই বর্তমানে শূন্য রয়েছে। মোট অনুমোদিত ১ হাজার ১২০টি জনবল পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯৫৪ জন এবং শূন্য রয়েছে ১২৬টি পদ। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে মোট ২১৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩০ জন। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ বা ৮৮টি চিকিৎসকের পদই শূন্য রয়েছে। ২৫০ শয্যার জনবল দিয়ে ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটি পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে রোগীদের ওষুধ ও খাবার সরবরাহের ওপরও।
হাসপাতালের বহির্বিভাগেও রোগীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত রোগী দেখার সময় নির্ধারিত থাকলেও ভোর থেকেই টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় রোগীদের। এরপর চিকিৎসকের কক্ষের সামনেও তৈরি হয় দীর্ঘ সারি। এতে গুরুতর অসুস্থ রোগী, শিশু ও বয়স্কদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এর ওপর প্যাথলজি বিভাগে জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় দুপুর ১২টার মধ্যেই পরীক্ষার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা নিরুপায় হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করাতে বাধ্য হন।
গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে হাসপাতালটির এমআরআই ও সিটি স্ক্যানসহ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অচল। বিশেষ করে এমআরআই মেশিনটি বিগত ১১ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বাইরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এই পরীক্ষাগুলো করাতে হচ্ছে। বিরল উপজেলার ৭০ বছর বয়সী নিউরো রোগী কাদের নেওয়াজের ছেলে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান জানান, তার বাবাকে ভর্তির পর চিকিৎসকেরা ৮ থেকে ১০টি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে মাত্র একটি রক্তের পরীক্ষা ছাড়া বাকি সব পরীক্ষাই বাইরে থেকে করাতে হয়েছে। একইভাবে কাহারোল উপজেলার সড়ক দুর্ঘটনায় আহত শরিফুলের ভাই জানান, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এক্স-রেসহ সব পরীক্ষা তাদের বাইরে থেকে করাতে হয়েছে। এই সুযোগে হাসপাতালের বহির্বিভাগ, প্যাথলজি, জরুরি বিভাগ ও প্রধান ফটকের আশপাশে দালালদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যারা কম খরচে দ্রুত পরীক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালের সিঁড়ি ও ফাঁকা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা এবং টয়লেট থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
হাসপাতালের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর কবির জানান, জনবল সংকটের কারণে কিছু সেবা দিতে বিঘ্ন ঘটছে। অচল যন্ত্রপাতি সচল করার চেষ্টা চলছে এবং ইতোমধ্যে অকেজো হয়ে পড়া এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন দুটিকে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন মেশিনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুতই এগুলো পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যান্য সচল যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে ১ হাজার শয্যার নতুন জনবল কাঠামোর একটি তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুতই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।



























