উচ্ছেদে সব হারানো সেই বৃদ্ধ শাহ আলম আবার কাজে ফিরলেন
- আপডেট সময় : ১১:১৫:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

শনিবার বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরের ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-১০ কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতের গাছের ছায়ায় বসে কাজ করছিলেন ৭৫ বছর বয়সী রিকশা-ভ্যান মেরামতের মিস্ত্রি শাহ আলম। কিছুক্ষণ আগেই একটি ভ্যানের সামনের চাকা মেরামতের কাজ শেষ করে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি। তাঁর পাশেই পড়ে ছিল কাঠের একটি পুরোনো বাক্স। গত বুধবারের উচ্ছেদ অভিযানের সময় ভেঙে যাওয়া সেই বাক্সটিই জোড়াতালি দিয়ে আবার ব্যবহার করছেন তিনি। বাক্সের ভেতরে রয়েছে নতুন করে কেনা সেলাই রেঞ্চ, হাতুড়ি, ডাল রেঞ্চ ও চাকার টিউবসহ নানা সরঞ্জাম। কয়েক দিন আগেও যে তিনি এখানে বসে আবার কাজ করতে পারবেন, তা ভাবতেও পারেননি শাহ আলম। উচ্ছেদ অভিযানে কাজের বাক্সসহ সব সরঞ্জাম হারিয়ে তখন তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন।
উচ্ছেদ অভিযানের সেই দুঃসহ দিনের কথা স্মরণ করে শাহ আলম জানান, ওই দিন পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয় এবং পরে একটি ভবনে আগুন ধরে যায়। পুলিশ সরে যাওয়ার পর দুপুরের দিকে প্রায় দেড় ঘণ্টা সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার দিকে বুলডোজার ও সিটি করপোরেশনের গাড়ি আসে উচ্ছেদ চালাতে। শাহ আলম বলেন, ‘আমি চাইসিলাম বাক্সটা সরাইয়া হালাই। পরে দেহি আমার বাক্স সহকারে ভাইঙ্গা দিতাসে। আমি বাক্স বাঁচাইতে গেসি। আমারে চার-পাঁচজন পুলিশ টাইনা নিয়ে গেসে। এহানদিয়া আমার মালসামানা, বাক্স ভাইঙগা যা ছিল সব লইয়া গেসে।’ পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার পর ফিরে এসে তিনি দেখেন, তাঁর উপার্জনের একমাত্র বাক্সটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। তখন মাথায় হাত দিয়ে বসে কাঁদছিলেন এই নিরীহ মানুষটি। কারণ, ফুটপাতে নয়, তিনি রাস্তার পাশে বসে রিকশা-সাইকেল মেরামতের কাজ করতেন এবং এ ছাড়া তাঁর আর কোনো সম্বল ছিল না।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভোলার বোরহানউদ্দিন থেকে ঢাকায় আসেন শাহ আলম। এরপর থেকেই তিনি রিকশা, সাইকেল ও ভ্যান মেরামতের কাজ করে আসছেন। বর্তমানে তিনি মিরপুরের বাইশটেকি আয়না মসজিদ এলাকায় থাকেন। তাঁর সংসারে পাঁচ-ছয়জনের খাবারের জোগান তাঁকেই দিতে হয়। তাঁর সঙ্গে থাকেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী, বড় মেয়ে ও দুই নাতি। ছোট মেয়ে থাকেন গ্রামের বাড়িতে এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন। নিজের আয় সম্পর্কে শাহ আলম জানান, দৈনিক আয় নির্দিষ্ট নয়; কাজের ওপরে নির্ভর করে ৩০০, ৪০০ বা কোনো দিন টেনেটুনে ৫০০ টাকা আয় হয়। উচ্ছেদে সব হারানোর পর নতুন করে কাজ শুরু করা তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে ভেঙে যাওয়া বাক্সটি মেরামত করে এবং প্রয়োজনীয় কিছু মালপত্র নতুন করে কিনে তিনি আবার কাজে নেমেছেন। বাকি সরঞ্জামগুলোও তিনি ধীরে ধীরে কেনার পরিকল্পনা করছেন।
উচ্ছেদ অভিযানে শাহ আলমের কাজের সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে তা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানের নজরে আসে। প্রশাসকের সহকারী একান্ত সচিব আল-আমীন আলম জানান, ফেসবুকের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তায় গত বৃহস্পতিবার শাহ আলমকে খুঁজে বের করা হয়। এরপর তাঁকে নগর ভবনে ডেকে নিয়ে কথা বলেন প্রশাসক। শাহ আলম প্রশাসককে জানান, উচ্ছেদে পুরোনো সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার পর নতুন করে কাজ শুরু করতে তিনি ২০ হাজার টাকা ঋণ করে কিছু সরঞ্জাম কিনেছিলেন। সব শুনে প্রশাসক তাঁকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। একই সঙ্গে রাস্তার পাশে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে কাজ করার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সহায়তা পাওয়ার পর আবার কাজে ফিরতে পেরে স্বস্তি পেয়েছেন শাহ আলম। শনিবার বিকেলে ভ্যানের চাকা মেরামত করতে করতে তিনি বলছিলেন, কাজ না করে তাঁর ঘরে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই, কারণ এই কাজের ওপরই তাঁর পুরো সংসার চলে। কথা শেষ করেই তিনি আবার কাজে মনোযোগ দেন এবং খোলা চাকার রিং হাতে তুলে নিয়ে নতুন উদ্যমে মেরামতের কাজ শুরু করেন।



























