জবি ছাত্রীকে র্যাবের আটকচেষ্টার নেপথ্যে ‘জিনের ভর’ ও চুরির মামলা
- আপডেট সময় : ০৭:৩৭:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রাক্তন ছাত্রী মমতাজ আরা বর্ষাকে সাদা পোশাকে আটক করতে গিয়ে র্যাবের তৈরি করা বিতর্কের নেপথ্যে উঠে এসেছে ‘জিনে ভর করার’ নাটক সাজিয়ে লাখ লাখ টাকা ও সোনার গয়না হাতিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর চুরির মামলা। ওই ঘটনার পর থেকে বর্ষা মেস ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাঁর মুঠোফোন বন্ধ এবং পরিবারের সঙ্গেও তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই বলে জানা গেছে। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, র্যাবের এক কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছ থেকে অর্থ ও সোনা চুরির মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে বর্ষাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করতে গিয়েছিল র্যাব। তবে ঘটনার দিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্র সংসদের বাধার মুখে তাকে আটক করা যায়নি।
বর্ষা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ২০২৩ সালে তাঁর স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিনি পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকার একটি সাততলা ভবনের সপ্তম তলার মেসে থাকতেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে সাতটার দিকে একটি মাইক্রোবাসে করে তিনজন সাধারণ পোশাক পরিহিত ব্যক্তি ওই মেসের সামনে যান। ভবনের নিরাপত্তাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা মেসে ঢুকে তল্লাশি চালান এবং গালিগালাজ ও ধাক্কাধাক্কি করে দরজা খুলতে বাধ্য করেন বলে বর্ষার রুমমেটরা অভিযোগ করেছেন। তারা কিছু না পেয়ে বর্ষাকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে মেসের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জকসু নেতাদের খবর দেন। পরে সেখানে র্যাবের আরেকটি গাড়ি এবং স্থানীয় থানার পুলিশ আসে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক জানান, প্রথমে ওই ব্যক্তিরা ভুল করে সেখানে এসেছেন বলে দাবি করলেও পরে জানান যে তাঁরা চুরির মামলার আসামি ধরতে এসেছেন। বর্ষাকে গাড়িতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাতে বাধা দেয়। জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত বর্ষাকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। ওই দিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে সংবাদ সম্মেলন করে বর্ষা দাবি করেন, তাঁর বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র্যাবের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে কর্মরত এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতেই তিনি র্যাবকে দিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। তবে র্যাব-২ জানিয়েছে, তাদের ইউনিটে সুমন নামে কেউ কর্মরত নেই এবং পূর্ণ নাম-পদবি ছাড়া বাহিনীর ১৫টি ব্যাটালিয়নের মধ্যে কাউকে শনাক্ত করা কঠিন।
এই ঘটনার অনুসন্ধানে গত ১২ আগস্ট রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের হওয়া একটি চুরির মামলার তথ্য পাওয়া যায়। মামলার বাদী একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে র্যাব-২–এ কর্মরত। তাঁর স্ত্রী একজন সিনিয়র সহকারী সচিব। মামলায় ওই কর্মকর্তার গাড়িচালক মো. রাসেল ও তাঁর স্ত্রী মাছুরা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, রাসেল তাঁর স্ত্রীর ওপর ‘জিন ভর করেছে’ দাবি করে ওই কর্মকর্তার স্ত্রীর বিশ্বাস অর্জন করেন। জিনের নির্দেশের কথা বলে এবং চেতনানাশক খাইয়ে ওই বাসা থেকে ১৪ লাখ টাকা ও ১০ ভরি সোনার গয়না চুরি করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া রাসেল ও মাছুরা পুলিশকে জানিয়েছেন, তাঁরা সেই চুরি করা সোনা বর্ষার কাছে বিক্রি করেছিলেন। ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসান জানান, রিমান্ডে থাকা আসামিদের কাছ থেকে সন্দেহভাজন হিসেবে বর্ষার নাম আসার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনে আটকের জন্য র্যাবের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়েছিল।
র্যাব-২-এর পরিচালক এবং পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নয়মুল হাসান দাবি করেছেন, অভিযানে কোনো আইনি ব্যত্যয় ঘটেনি। এজাহারনামীয় আসামি ধরতেই র্যাব সেখানে গিয়েছিল, কিন্তু আসামি যেন ধরা না পড়ে সেজন্য সেখানে চাপ সৃষ্টি করা হয়। অন্যদিকে, জবির সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির জানান, প্রথমে যারা বর্ষাকে আটক করতে এসেছিলেন, তাঁরা পরিচয়পত্র বা মামলার কোনো নথি দেখাতে পারেননি beauties বলেই সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল। ৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বর্ষা বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধী হলে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী তাঁর বিচার হবে।
বর্তমানে বর্ষার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কলতাবাজারের মেসের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বর্ষা দুটি টিউশনি করে সাড়ে সাত হাজার টাকা আয় করতেন, যার মধ্যে ছয় হাজার টাকাই মেস ভাড়ায় চলে যেত। তবে মাস তিনেক আগে তিনি টিউশনি ছেড়ে দেন। ভবনের নিরাপত্তাকর্মী জানান, বর্ষা চলে যাওয়ার আগে তাঁকে বলে গিয়েছিলেন যেন কেউ খুঁজলে বলা হয় তিনি সেখানে থাকেন না। দিনাজপুরে থাকা বর্ষার বোন বৃষ্টি জানান, বর্ষা একসময় অনলাইনে কাজ করতেন এবং হ্যাকিংয়ে পারদর্শী ছিলেন। বাবার পাঠানো টাকা এবং টিউশনির আয়েই তিনি চলতেন। গত কয়েকদিন ধরে পরিবারের সঙ্গেও বর্ষার কোনো যোগাযোগ নেই বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।

























