Header Premium (728×90)

প্রস্পেরো কি শেক্সপিয়ারের আত্মপ্রতিকৃতি: ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকের এক গভীর বিশ্লেষণ

উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের কালজয়ী নাটক ‘দ্য টেম্পেস্ট’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রস্পেরোর ‘শিল্প’ আসলে কী— তা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে আলোচনা চলে আসছে। এটি কি কেবল জাদু, নাকি নাট্যরচনারই এক ভিন্ন রূপ? নাটকটি গভীরভাবে পাঠ করলে জাদু ও নাট্যরচনার মধ্যে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য চোখে পড়ে। একজন জাদুকর যেমন মানুষ, বস্তু ও ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট ফল নিয়ে আসেন, তেমনি একজন নাট্যকারও চরিত্র, সংলাপ ও ঘটনার বিন্যাসের মাধ্যমে দর্শকের সামনে একটি সম্পূর্ণ নতুন জগৎ তৈরি করেন। এই সাদৃশ্য থেকেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে: প্রস্পেরো কি আসলে শেক্সপিয়ারের আত্মপ্রতিকৃতি?

১৭৪০ সালে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের কবিদের কোণে শেক্সপিয়ারের একটি প্রায় জীবন-সমান মূর্তি স্থাপন করা হয়। এই মূর্তিতে নাট্যকারকে এক স্তূপ বইয়ের ওপর কনুই রেখে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায়, যেখানে তাঁর আঙুল একটি পাণ্ডুলিপির দিকে নির্দেশ করছে। সেই পাণ্ডুলিপিতে ‘দ্য টেম্পেস্ট’–এর বিখ্যাত কয়েকটি পঙ্‌ক্তির একটি পরিবর্তিত রূপ লেখা রয়েছে: ‘মেঘছোঁয়া মিনার, জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ, গম্ভীর মন্দির, এই বিরাট পৃথিবী— তার সবকিছুই একদিন মিলিয়ে যাবে; স্বপ্নের মতো এই অসার নির্মাণ শেষে কোনো চিহ্নও রেখে যাবে না।’ শেক্সপিয়ারের মূর্তির সঙ্গে ‘দ্য টেম্পেস্ট’–এর এই পঙ্‌ক্তিগুলো জুড়ে দেওয়ার কারণ হলো, এই নাটকের গভীরে জাদু এবং থিয়েটারের মধ্যে এক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করা হয়েছে।

প্রস্পেরো একজন শক্তিশালী জাদুকর হলেও তার জাদু অনেক সময় নাট্যমঞ্চের কৌশলের মতোই কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, ক্যালিবান ও তার সঙ্গীদের জন্য সাজানো ঝলমলে পোশাক আসলে এক ধরনের নাট্য-প্রপ। আবার, এরিয়েল যখন হার্পির বেশে মঞ্চে এসে টেবিলে ডানা ঝাপটায়, তখন এক বিশেষ কৌশলে ভোজের খাবার অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ধরনের দৃশ্যের জন্য মঞ্চের যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হতে পারে, যেমন তখনকার লোকজ বিনোদনে দেখা যেত এমন কোনো ঘূর্ণনশীল টেবিল। অর্থাৎ, প্রস্পেরো অনেকটা একজন নাট্যকারের মতোই কাজ করেন— তিনি মানুষকে পরিচালনা করেন, বস্তু ব্যবহার করেন, দৃশ্য তৈরি করেন এবং একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে সবকিছুকে এমনভাবে সাজান, যাতে তার কাঙ্ক্ষিত ফল আসে। তার কাছে জাদু যেন এক বিশেষ ধরনের মঞ্চ-প্রযুক্তি।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রস্পেরো শুধু বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করেন না, তিনি অন্য চরিত্রগুলোর অতীতকেও নিয়ন্ত্রণ করেন। তার ভাই কীভাবে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, কীভাবে তারা দ্বীপে নির্বাসিত হয়েছিলেন, এরিয়েল কীভাবে একটি গাছে বন্দী ছিল, ক্যালিবানের মা সাইকোরাক্স কে ছিলেন— এসব অতীতের কাহিনি মূলত আমরা প্রস্পেরোর কাছ থেকেই জানতে পারি। নাটকটিতে এর কোনো স্বাধীন সূত্র নেই। তাই মনে হতে পারে, প্রস্পেরো শুধু চরিত্রদের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ করছেন না, তিনি তাদের অতীতও তৈরি করছেন। ঠিক যেমন একজন নাট্যকার চরিত্রের বর্তমান আচরণকে অর্থপূর্ণ করার জন্য তার একটি অতীত নির্মাণ করে দেন। এই কারণেই নাটকের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশগুলোর একটি বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে।

প্রস্পেরো তার বিখ্যাত উক্তিতে বলেন, ‘আমাদের সব আয়োজন শেষ। যাদের অভিনেতা বলেছিলাম, তারাও আত্মার মতো মিলিয়ে গেছে। বাতাসে, এই পাতলা বাতাসে তারা হারিয়ে গেছে। স্বপ্নের মতো এই অসার নির্মাণও একদিন মিলিয়ে যাবে। মেঘছোঁয়া মিনার, প্রাসাদ, মন্দির— এমনকি এই বিরাট পৃথিবীও। সবকিছুই একদিন শেষ হবে। আমরা সবাই স্বপ্ন দিয়ে তৈরি; আর আমাদের ছোট্ট জীবন ঘুমের মধ্যেই শেষ হয়।’ এখানে প্রস্পেরোর জাদু আর থিয়েটারের সীমারেখা প্রায় মুছে যায়। তার তৈরি দৃশ্য যেমন ক্ষণস্থায়ী, মঞ্চের নাটকও তেমন। অভিনেতারা আসে, কিছু সময়ের জন্য একটি জগৎ তৈরি করে, তারপর মঞ্চ থেকে সরে যায়। দর্শকের সামনে যে প্রাসাদ, ঝড়, দ্বীপ, প্রেম, প্রতিশোধ ও ক্ষমার জগৎ তৈরি হয়েছিল, শেষ দৃশ্যের পর তার কিছুই আর থাকে না। এই অর্থে প্রস্পেরো একজন নাট্যকারের মতোই।

তবে প্রস্পেরো কেবল একজন নাট্যকার নন, তিনি একজন পণ্ডিতও। তার ক্ষমতার মূল উৎস তার বই। তিনি এক ধরনের রেনেসাঁস যুগের জ্ঞানী জাদুকর, যার কাছে বিজ্ঞান, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, জাদুবিদ্যা ও গুপ্তবিদ্যার মধ্যে আজকের মতো কঠিন বিভাজন ছিল না। শেক্সপিয়ারের সময়ে জ্ঞান ও জাদুকে আধুনিক অর্থে পরস্পরের বিপরীত বলে দেখা হতো না। একজন শিক্ষিত মানুষ একই সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করতে পারতেন, আবার জ্যোতিষ, আলকেমি কিংবা আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ নিয়েও আগ্রহী হতে পারতেন। জন ডি ছিলেন এমনই একজন রেনেসাঁস মনীষী, যিনি গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও নৌবিদ্যার পাশাপাশি জ্যোতিষ, আলকেমি এবং আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের চর্চা করতেন।

প্রস্পেরোর ক্ষমতার কেন্দ্রেও তাই বইয়ের অবস্থান। ক্যালিবান বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বোঝে। সে যখন প্রস্পেরোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, তখন বলে যে প্রস্পেরোর বইগুলো ধ্বংস করতে হবে। কারণ বই ছাড়া প্রস্পেরো আর তেমন কিছুই নন; তার আত্মাদের ওপর কোনো ক্ষমতাও থাকবে না। প্রস্পেরো নিজেও তার বইয়ের গুরুত্ব স্বীকার করেন। মিরান্ডাকে তিনি বলেন, রাজ্য পরিচালনার বাস্তব কাজ থেকে তিনি ক্রমে দূরে সরে গিয়েছিলেন, কারণ তার মন ছিল জ্ঞানের গভীরে। তার কাছে তার লাইব্রেরিই ছিল একটি বিশাল রাজ্য। এই দিকটি চরিত্রটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। প্রস্পেরো ক্ষমতা পেয়েছেন অস্ত্র দিয়ে নয়, জ্ঞান দিয়ে। তার রাজদণ্ডের মতোই তার বই একটি ক্ষমতার প্রতীক।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে সেই ক্ষমতা ত্যাগ করতে হয়। নাটকের শেষ দিকে প্রস্পেরো সিদ্ধান্ত নেন, তার জাদুর দিন শেষ। তখন দুটি প্রতীকী কাজ জরুরি হয়ে ওঠে— তিনি তার জাদুর দণ্ড ভেঙে ফেলবেন এবং তার বই সমুদ্রের গভীরে ডুবিয়ে দেবেন। এই দৃশ্যের সঙ্গে ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘ডক্টর ফস্টাস’–এর কথা মনে পড়ে, যেখানে মৃত্যুর মুখোমুখি ফস্টাসও তার বই পুড়িয়ে ফেলার কথা বলেন। শেক্সপিয়ারের জীবনের শেষদিকের একটি নাটকে মার্লোর সেই উত্তরাধিকার যেন আবার ফিরে আসে। ১৫৯৩ সালে অকালে মার্লো মারা না গেলে ইংরেজি নাটকের ইতিহাস হয়তো অন্য রকম হতে পারত।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। প্রস্পেরো একজন পণ্ডিত, একজন শিল্পী, একজন জাদুকর— কিন্তু তাই বলে তিনি শেক্সপিয়ারের আত্মপ্রতিকৃতি, এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের মূর্তিটি অবশ্য এই ধারণাটিকেই শক্তিশালী করেছে। শেক্সপিয়ারের মূর্তির হাতে বই, পাশে ‘দ্য টেম্পেস্ট’–এর পঙ্‌ক্তি— সব মিলিয়ে মনে হয়, প্রস্পেরো যেন শেক্সপিয়ারেরই আরেক রূপ। কিন্তু শেক্সপিয়ারের সময়ে কোনো লেখক নিজের জীবনের দীর্ঘ আত্মপ্রতিকৃতি নাটকের মধ্যে নির্মাণ করেছেন— এমন নজির খুব বেশি নেই। বরং নাট্যকারের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা ছিল নিজের পরিচয় ভুলে অন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রবেশ করা।

একজন ভালো নাট্যকার একই সঙ্গে রাজা, ভিখারি, খুনি, প্রেমিক, নির্বাসিত কিংবা প্রতারকের কণ্ঠে কথা বলতে পারেন। তাই প্রস্পেরোকে সরাসরি শেক্সপিয়ারের প্রতিচ্ছবি ভাবা হয়তো নাটকটির জটিলতাকে কমিয়ে দেয়। বরং আধুনিক মঞ্চায়নগুলো প্রস্পেরোর চরিত্রে আরেকটি অস্বস্তিকর দিক সামনে এনেছে। তিনি শুধু জ্ঞানী বৃদ্ধ নন; তিনি ক্ষমতাবান এবং নিয়ন্ত্রণপ্রবণ একজন মানুষ। দ্বীপের ওপর তার কর্তৃত্ব, ক্যালিবানের ওপর তার শাসন এবং অন্যদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাকে সব সময় মহৎ শিল্পীর প্রতিমূর্তি করে তোলে না। কখনো তিনি প্রজ্ঞাবান বৃদ্ধের চেয়ে বেশি মনে হন একজন আধিপত্য আসক্ত শাসক হিসেবে।

শেক্সপিয়ারের অন্য কিছু শিল্পীসুলভ চরিত্রের মধ্যেও এমন অন্ধকার দিক আছে। ‘ওথেলো’–র ইয়াগো কিংবা ‘মেজার ফর মেজার’–এর ডিউক— তারাও মানুষের জীবন ও পরিস্থিতিকে এক ধরনের নাট্যকারের মতো সাজান। তাদের সৃজনশীল শক্তি প্রবল, কিন্তু তারা নৈতিকভাবে আদর্শ চরিত্র নন। প্রস্পেরোকেও তাই শুধু শেক্সপিয়ারের মহিমান্বিত প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখলে তার চরিত্রের বিপজ্জনক দিকটি চোখ এড়িয়ে যায়। হয়তো ‘দ্য টেম্পেস্ট’–এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্নটি শেক্সপিয়ারের নিজের পরিচয় নিয়ে নয়। বরং প্রশ্নটি হলো— যে মানুষ অন্যদের জীবনকে গল্পের মতো সাজাতে পারে, তার নিজের ক্ষমতার সীমা কোথায়?

প্রস্পেরো শেষ পর্যন্ত তার জাদুর দণ্ড ভেঙে ফেলেন, বই সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন এবং আধিপত্য ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একজন শিল্পীর জন্য সেটিই হয়তো সবচেয়ে কঠিন কাজ— নিজের তৈরি জগতের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নেওয়া। কারণ জাদু হোক কিংবা থিয়েটার— দুটিই মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বিশ্বাস করায় যে অসম্ভবও সম্ভব। কিন্তু পর্দা নামার পর মঞ্চ খালি হয়ে যায়। আর থেকে যায় শুধু গল্পটি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

শ্রীমঙ্গলে বই পড়ে ল্যাপটপ পেলেন ৮ শিক্ষার্থী

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বই পড়ে মেধা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতায় আট শিক্ষার্থী ল্যাপটপ জিতেছেন। শনিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের…

1 minute ago

মক্কায় ওমরাহ পালন করে আবেগঘন পোস্ট অভিনেত্রী কেয়া পায়েলের

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় ওমরাহ পালন করেছেন ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী কেয়া পায়েল। ধর্মীয় এই…

5 minutes ago

কাফকার সাহিত্য ও ক্ষমতার জটিল সমীকরণ: এক গভীর বিশ্লেষণ

ফ্রানৎস কাফকার সাহিত্য কীভাবে ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামো ও ব্যক্তির অস্তিত্বের সংকটকে ফুটিয়ে তুলেছে, তা নিয়ে…

21 minutes ago

আওয়ামী লীগ নতুন ষড়যন্ত্র করতে পারে, সতর্ক থাকার আহ্বান টুকুর

ফ্যাসিবাদীদের কোনো অনুশোচনা নেই উল্লেখ করে নিষিদ্ধঘোষিত কর্মকাণ্ডে জড়িত আওয়ামী লীগ নতুন ষড়যন্ত্র করতে পারে…

27 minutes ago

নবাবগঞ্জে নানা কর্মসূচিতে চড়ারহাট গণহত্যা দিবস পালন

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়েছে ‘১০ অক্টোবর চড়ারহাট গণহত্যা দিবস’। এ উপলক্ষে উপজেলা…

29 minutes ago

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস: কর্মকর্তাদের দিকে সন্দেহের আঙুল

উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা…

30 minutes ago

This website uses cookies.