Header Premium (728×90)

Categories: মতামত

গ্যারান্টি ক্লজসহ নতুন গঙ্গা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য লাভজনক: ড. আবুল হোসেন

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য গ্যারান্টি ক্লজ বা পানির নিশ্চয়তার শর্ত অন্তর্ভুক্ত করে একটি নতুন চুক্তি সম্পাদন করা সবচেয়ে লাভজনক হবে বলে মনে করেন যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পানি ব্যবস্থাপনা, পানি অর্থনীতি ও আন্তসীমান্ত নদী সহযোগিতা বিশেষজ্ঞ ড. হোসেন গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশের প্রস্তুতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলোর অববাহিকাভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

চুক্তির সীমাবদ্ধতা ও গ্যারান্টি ক্লজের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে ড. হোসেন জানান, ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য একটি গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, যা ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে রাখা হয়নি। ওই গ্যারান্টি ক্লজ অনুযায়ী, ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানিপ্রবাহ যদি ৮০ শতাংশের নিচে নেমে যেত, তবে বাংলাদেশ তার নির্ধারিত অংশের ৮০ শতাংশ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পেত। অর্থাৎ, ঘাটতিজনিত কম প্রবাহের ধকল শুধু ভারতকে পোহাতে হতো। কিন্তু ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ৩৫ হাজার কিউসেকের একটি পালাক্রমিক বণ্টনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে মার্চ মাসের দ্বিতীয় ১০ দিন থেকে বাংলাদেশ ও ভারত পালাক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পায়। এই ব্যবস্থার কারণে ভারত যখন তার ভাগের ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পায়, তখন বাংলাদেশের প্রাপ্তি অনেক সময় কমে মাত্র ২০ হাজার কিউসেকের কাছাকাছি নেমে আসে, যা দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক সংকট তৈরি করে।

ড. হোসেন মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় গ্যারান্টি ক্লজসহ একটি নতুন গঙ্গা চুক্তি করাই বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম পথ। তবে তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে বর্তমান চুক্তিটিই নবায়ন করতে হবে। বর্তমান চুক্তিতে রিভিউ বা পুনমূল্যায়ন করার সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রথমে চুক্তিটি নবায়ন করে পরবর্তীতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে তা পুনমূল্যায়ন করা যেতে পারে। গঙ্গা ছাড়াও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত অন্য ৫৩টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তির ওপর জোর দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট আন্তসীমান্ত অববাহিকার ৫০ শতাংশ চুক্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। পানিবণ্টন চুক্তি না থাকার কারণে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পানি পাচ্ছে না এবং বর্ষায় আকস্মিক বন্যার মুখে পড়ছে, যার ফলে কৃষি, অর্থনীতি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চুক্তি থাকলে দেশ নদী ব্যবহারের সঠিক ও সর্বোত্তম পরিকল্পনা করতে পারবে।

আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভারতের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার নীতির কথা উল্লেখ করে ড. হোসেন বলেন, ভারতকে অববাহিকাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার সুফল বোঝাতে হবে। চীন, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশকে নিয়ে যদি একটি 'ব্রহ্মপুত্র নদী বেসিন কমিশন' গঠন করা যায়, তবে নদী ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হবে এবং সর্বোচ্চ সুফল অর্জন করা যাবে। বিশ্বে এমন ১০১টি নদী কমিশন থাকলেও দুর্ভাগ্যবশত দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো কমিশন নেই। নদী থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে হলে একটি যৌথ মহাপরিকল্পনা, অভিন্ন তথ্যকেন্দ্র স্থাপন, যৌথ গবেষণা, হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, পলি ব্যবস্থাপনা এবং যৌথ বন্যা পূর্বাভাস মডেল তৈরি করা দরকার। এর মাধ্যমে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-ইরাবতী-সালউইন-মেকং নৌপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগও উন্নত করা সম্ভব।

আন্তসীমান্ত পানি বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিশ্বের সফল ও ব্যর্থ উদাহরণগুলো তুলে ধরেন যৌথ নদী কমিশনের এই সাবেক সদস্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা (যেমন ইউএস-কানাডা আইজেসি বা ইউএস-মেক্সিকো আইবিডব্লিউসি), তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা (যেমন সিন্ধু চুক্তিতে বিশ্বব্যাংক), সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা এবং সুবিধা ভাগাভাগির পদ্ধতির কারণে অনেক দেশ সফল হয়েছে। অন্যদিকে, সহযোগিতার অভাব, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করা, পানি-আধিপত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতির কারণে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিরোধ রয়ে গেছে।

অবশেষে, পানির পরিমাপ ভাগাভাগির সনাতন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে 'সুবিধা ভাগাভাগি' বা বেনিফিট শেয়ারিংয়ের ধারণাকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান ড. হোসেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইউরোপের রাইন নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে ছয়টি দেশের যৌথ উদ্যোগের ফলে ১৯২০ সালের পর বিলুপ্ত হওয়া স্যামন মাছ ২০০০ সালে আবার ফিরে এসেছে। বাংলাদেশ ও ভারত অনুরূপ যৌথ উদ্যোগ নিলে তিস্তার বোয়ালি এবং গঙ্গার ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পুনরুদ্ধার সম্ভব। পানি নিয়ে সংঘাত কোনো টেকসই সমাধান নয়; বরং গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকিকায় চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের মধ্যে বহুপক্ষীয় সুবিধা ভাগাভাগির মাধ্যমে যৌথ নৌ চলাচল, প্রযুক্তি বিনিময়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু…

1 minute ago

বনশ্রীতে কুকুরকে খাওয়াতে গিয়ে তরুণীকে মারধর, থানায় অভিযোগ

রাজধানীর বনশ্রীতে পথকুকুরকে খাবার দিতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলার শিকার হয়েছেন এক তরুণী। গত মঙ্গলবার রাতে…

6 minutes ago

ঈশ্বরদীতে ক্রেতা সেজে দুই ভরি স্বর্ণের মালা নিয়ে চম্পট

পাবনার ঈশ্বরদীতে ক্রেতার পরিচয়ে দোকানে ঢুকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা মূল্যের দুই ভরি স্বর্ণের মালা…

32 minutes ago

গোপালগঞ্জে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মাঝে দুই লাখ টাকার অনুদানের…

41 minutes ago

ইবির আইন অনুষদের ১৯ শিক্ষার্থী সিভিল জজ পদে মনোনীত

অষ্টাদশ বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আইন অনুষদ থেকে ১৯…

53 minutes ago

নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান কখনো মাথা নত করবে না: পেজেশকিয়ান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা…

1 hour ago

This website uses cookies.