Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

রবীন্দ্রনাথের রান্নাঘরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাচক গেদু মিয়ার স্মৃতি

বিংশ শতাব্দীর আটের দশকের শুরুর দিকে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হকের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সন্ধান মেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যক্তিগত বাবুর্চি আবদুন নূরের, যিনি ‘গেদু মিয়া’ নামেই সমধিক পরিচিত। তৎকালীন সরকারি পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে পিয়নের চাকরি করতেন তিনি। ১৯৮২ সালের শুরুর দিকে গ্রিন রোডের গ্রিন সুপার মার্কেটের দপ্তরে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। অত্যন্ত নম্র স্বভাবের গেদু মিয়া নিজের জীবনের এই অনন্য অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন এক চমৎকার গল্পের মতো করে।

গেদু মিয়ার জন্ম ১৯১৬ সালে, বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুরের মিঞাহাটিতে। দারিদ্র্যের কারণে ১৯৩০ বা ১৯৩১ সালের দিকে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি মামার সঙ্গে কলকাতায় পাড়ি জমান। সেখানে জর্জ গ্রেগরি নামের এক ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের সান্নিধ্যে রান্নাবান্নার তালিম নেন তিনি। ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেগরি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেই সময়ে কবি হজমশক্তির সমস্যায় ভুগছিলেন এবং তাঁকে মসলাবিহীন সেদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট। সেই সূত্র ধরেই রবীন্দ্রনাথের বাবুর্চি হিসেবে নিয়োগ পান গেদু মিয়া।

১৯৩৯ সালে ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেগরি নিজ গাড়িতে করে গেদু মিয়াকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁকে নিজের রান্নার দায়িত্ব দেন। কবি নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন ব্রাহ্মণ ও উড়িয়া অন্য দুই বাবুর্চির কাছে নিজের পরিচয় গোপন রাখেন। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত মোট দুই বছর তিনি কবির সান্নিধ্যে ছিলেন। অসুস্থতার কারণে পরে কবি তাঁকে বিদায় জানাতে বাধ্য হন, তবে যাওয়ার সময় নিজের হাতে লিখে প্রশংসাপত্র ও উপহার হিসেবে একটি স্যুপ জার ও হুঁকো দিয়েছিলেন।

শান্তিনিকেতন ও কালিম্পংয়ে কবির সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা স্মরণ করে গেদু মিয়া বলেন, কবি তাঁকে সবসময় চোখ-কান খোলা রেখে মুখ বন্ধ রাখার পরামর্শ দিতেন। একবার জন্মদিনে দর্শনার্থীদের দেওয়া মিষ্টি অন্য বাবুর্চিদের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে কবি বলেছিলেন, সুখে সবাইকে পাশে পাওয়া যায়, কিন্তু দুঃখের সময় কাউকে পাওয়া যায় না। এছাড়া বাঙালি মুসলমান সমাজের শিক্ষার পিছিয়ে পড়া নিয়ে কবি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফেরার পথে রানাঘাটে দাঙ্গাবাজদের কবলে পড়েন গেদু মিয়া। সে সময় তাঁর নগদ অর্থ ও রবীন্দ্রনাথের দেওয়া প্রশংসাপত্রটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তবে কোনোমতে স্যুপ জার ও হুঁকোটি রক্ষা করতে পেরেছিলেন। গেদু মিয়া দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক ছিলেন। ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরে চাকরিতে যোগ দিয়ে ১৯৮৩ সালের দিকে অবসর গ্রহণ করেন। ২০০১ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

নামফলকে নিজের নাম দেখে উদ্বোধন না করেই ফিরলেন এমপি হাসনাত

উদ্বোধনী নামফলকে নিজের নাম খোদাই করা দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ…

4 minutes ago

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে জাতিসংঘে রাশিয়ার কড়া বার্তা

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন এবং…

8 minutes ago

যশোরের চৌগাছায় পুকুরে ডুবে আড়াই বছরের মামা-ভাগিনার মৃত্যু

যশোরের চৌগাছায় পুকুরের পানিতে ডুবে আড়াই বছর বয়সী মামা ও ভাগিনার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। রবিবার…

14 minutes ago

বাংলা কিউআরে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেনে প্রণোদনা

বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে…

17 minutes ago

পীরগাছায় সার ডিলার নিয়োগে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ, বিএনপি নেতা জড়িত

রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার…

24 minutes ago

ঢাকার ৩৫ এলাকায় ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকি, অক্টোবরে বাড়তে পারে প্রকোপ

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৩৫টি এলাকা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত…

26 minutes ago

This website uses cookies.