রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। নয়টি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই নয়জনের একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এই আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই তালিকায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্ত্রীর নামও রয়েছে। একই সঙ্গে সাতটি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের বিপরীতে ১৫ লাখ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পীরগাছা উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে নয়জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে যে তালিকা ছড়িয়েছে, তাতে কল্যাণী ইউনিয়নে জিকরুল আমিন, পারুলে আব্দুল মতিন, ইটাকুমারীতে মাহমুদুল হাসান, অন্নদানগরে জয়িতা আক্তার জেমি, ছাওলায় জাকির হোসেন, তাম্বুলপুরে সুইটি, পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সুলতানা ফেরদৌসী, কৈকুড়িতে তৌফিক এবং কান্দিতে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমানের নাম রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টাকা উৎকোচ দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
রংপুর জেলা প্রশাসনের গত ৩১ আগস্টের বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে পীরগাছার নয়টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে একজন করে মোট নয়জন সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, কল্যাণী ইউনিয়নে ১৫ লাখ, ইটাকুমারীতে ১৭ লাখ, অন্নদানগরে ১৫ লাখ, পারুলে ১৮ লাখ, কান্দিতে ২৭ লাখ, ছাওলায় ২৩ লাখ এবং কৈকুড়িতে ১৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এই সাতটি ইউনিয়নের কথিত অর্থের হিসাব যোগ করলে মোট ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা দাঁড়ায়।
এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা। সহযোগী হিসেবে সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের নামও উঠে এসেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, ডিলার বাছাইয়ে এই দুই নেতা প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং পছন্দের প্রার্থীকে ডিলার করতে কোথাও অর্থ লেনদেন হয়েছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া তালিকায় পীরগাছা সদর ইউনিয়নে সুলতানা ফেরদৌসী এবং তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সুইটির নাম রয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সুলতানা ফেরদৌসী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার স্ত্রী এবং সুইটি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের স্ত্রী। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, এত আবেদনকারীর মধ্যে একই উপজেলার শীর্ষ দুই রাজনৈতিক নেতার স্ত্রী কীভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়নের ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত হলেন। তাদের যোগ্যতা, আবেদনপত্র, গুদাম, ব্যাংক সচ্ছলতার সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্যান্য কাগজপত্র কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে আসেনি।
ডিলার নিয়োগের অভিযোগের মধ্যে অন্নদানগর ইউনিয়নের কীটনাশক ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী আব্দুর রহিমের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই কথোপকথনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার নাম উল্লেখ করে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা উৎকোচের প্রসঙ্গ এসেছে। এই অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
তাম্বুলপুর ইউনিয়নের ডিলার প্রার্থী সুইটিকে নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, তিনি আগে পীরগাছা সদর ইউনিয়নের ভোটার ছিলেন এবং ডিলার নিয়োগের আবেদনের আগে তাকে তাম্বুলপুর ইউনিয়নে ভোটার হিসেবে স্থানান্তর করা হয়। পরে ওই ইউনিয়ন থেকে তার আবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর রংপুর জেলা বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রতিনিধি ও স্থানীয় বিএনপি নেতা জিয়াউর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কান্দি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক জিয়াউর রহমানকে দেওয়া ওই নোটিশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য, মন্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভেদ ও সাংগঠনিক বিরোধ সৃষ্টির অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। নোটিশে তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে এবং অভিযোগের বিষয়ে ঘটনার তারিখ, সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট বা মন্তব্যের প্রকৃতি এবং নিজের বক্তব্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংযুক্ত করতে বলা হয়। জিয়াউর রহমান এর আগে ডিলার নিয়োগে অর্থ লেনদেন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং পছন্দের প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছিলেন। ফলে এই নোটিশ স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জিয়াউর রহমান বলেন, “আমি যা বলেছি এবং ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছি তার সব প্রমাণ আমার কাছে আছে। পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙা উপজেলা বিএনপির তৃণমূলকে বিভক্ত করে রেখেছেন। সবকিছুর প্রমাণ আমার কাছে আছে।”
সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগেও বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অন্নদানগর ইউনিয়নের ডিলার পদপ্রার্থী আব্দুস ছাত্তার সরকার পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সার, বীজ, বালাইনাশক ও কৃষি উপকরণের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করে অভিযোগ করেছেন যে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আরেক আবেদনকারী তৈয়ব হোসেন বলেন, বিশেষ করে সাত ইউনিয়নে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ, অডিও ক্লিপ, লিখিত অভিযোগ এবং নয়জনের নামের তালিকা একই সময়ে সামনে আসায় বিষয়টি এখন শুধু দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি বাছাই কমিটির নথি যাচাইও জরুরি। আব্দুস ছালাম নামে আরেক আবেদনকারী বলেন, সারের ডিলার নিয়োগ সরাসরি কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত এবং রংপুরে এর আগেও সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম, মজুত ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনিক নজরদারির কথা প্রকাশ্যে এসেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজ তাম্বুলপুর ইউনিয়নে সারের ডিলার আবেদনে তার স্ত্রীর নাম থাকার কথা স্বীকার করলেও অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেন, “আমরা রাজনীতি করি, আমাদের স্ত্রীরাই সংসারসহ ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করে থাকেন।” পীরগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন, পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। তবে গত ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তবে সদস্য সচিব পরিতোষ চক্রবর্তী বলেন, “উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সম্পাদক দীর্ঘ ১৭ বছর অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে রাজনীতি করেছে। সেক্ষেত্রে তাদের স্ত্রী-কন্যারা ডিলারশিপ পেতেই পারে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার।” তিনি আরও বলেন, “কেউ ডিলারশিপ পেলে চা-মিষ্টি খাওয়াতেই পারেন, এটা দোষের কিছু না।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমীন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, “কমিটির সভাপতি হিসেবে ইউএনও মহোদয় বলতে পারবেন।” পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ ইমরুল মুজাক্কিন বলেন, “স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতি ইউনিয়নে তিনজনের তালিকা তৈরি করে আমরা পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তিনিই জবাব দেবেন।” গত ২০ সেপ্টেম্বর লিখিত অভিযোগের কথা অস্বীকার করে জেলা প্রশাসক রংপুর ইসরাত জাহান বলেন, “সুনির্দিষ্টভাবে কেউ আমাকে অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে ইরান প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তবে একই সঙ্গে…
চুয়াডাঙ্গার ভিমরুল্লা নতুন জেলখানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩০০ পিস ইয়াবাসহ নাজমা বেগম (৭০) নামে এক…
এশিয়ান গেমসের ক্রিকেটে সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে খেলছে বাংলাদেশ। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ আটের এই ম্যাচটি যদি…
মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে চাকরিচ্যুত ২ সেনাসদস্যসহ চক্রের ৭ জনকে গ্রেপ্তার…
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন…
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত বিষয় বাদ দিয়ে প্রশাসনের কাজের…
This website uses cookies.