Header Premium (728×90)

ফ্রান্সে শিক্ষার্থী বিক্ষোভে উত্তাল, বন্ধ ২০০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংঘর্ষ ও ধরপাকড়

ফ্রান্সে আজ মঙ্গলবার দিনভর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবরোধ ও বিক্ষোভ চলছে। অর্থসংকট, কর্মীর ঘাটতি এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো সরকারের কাছে বিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধানের দাবি জানাচ্ছে। এই দেশব্যাপী বিক্ষোভের আগে গত দুই সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলছিল, যা প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত শহরতলিতে শুরু হয়ে পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভের সময় কিছু এলাকায় সহিংসতাও দেখা গেছে। বিবিসির খবর অনুযায়ী, আজ প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকালে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়েছে। শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রায় ৯০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্লাস স্থগিত করেছে। তবে ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন দাবি করেছে, দেশজুড়ে প্রায় দুই হাজার মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

সরকার বিক্ষোভ মোকাবিলায় দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করেছে, যার ফলে ব্যাপক ধরপাকড় হয়েছে। সংঘর্ষে বিক্ষোভকারী, পুলিশ সদস্য এবং বিদ্যালয়ের কর্মীরা আহত হয়েছেন। ফ্রান্সের বিভিন্ন জায়গায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হলেও লিয়োঁসহ কিছু এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে, এমনকি পুলিশের ব্যারিকেডে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে ৮৬ হাজার প্রতিবাদকারী রাস্তায় নেমেছে। এই হিসাবের মধ্যে প্যারিসের বিক্ষোভকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যেখানে ২০ থেকে ৪০ হাজার বিক্ষোভকারী অংশ নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই অস্থিরতা সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। সরকার বর্তমানে ক্রমবর্ধমান বাজেটঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে। আগামী ছয় মাস পরই প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি বেছে নিতে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। গত কয়েক দিনে ফ্রান্সের ঋণের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা চলতি শতকের শুরুর দিকের পর আর দেখা যায়নি।

ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মেরিন লঁ পেন সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা তুলে ধরে আর্থিক বিষয়ে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজেট আলোচনায় ফ্রান্সের নিট চাঁদা ৫০০ কোটি ইউরোতে (৫৬১ কোটি মার্কিন ডলার) নামিয়ে আনার দাবি তুলবেন। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ফ্রান্সে বিক্রির অনুপাতে তাদের ওপর কর বসিয়ে করপোরেট কর এড়ানোর কৌশল ঠেকাতে চান তিনি। লঁ পেন মনে করেন, ফ্রান্স ক্রমেই ফুলেফেঁপে ওঠা এক ঋণসংকটের দ্বারপ্রান্তে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০২৭ সালের নির্বাচনে ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নিলে দেশটি ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তিনি চান, প্রতিবছরের বাজেট ধাপে ধাপে ঋণ কমাক, যাতে একসময় ঋণ জিডিপির ৬০ শতাংশে নেমে আসে। সরকারে গেলে তাঁর লক্ষ্য হবে, আর্থিক বাজারকে বোঝানো যে ফ্রান্স আবার ‘আস্থাভাজন’ হয়ে উঠেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি ঘাটতি ৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান লঁ পেন এবং প্রেসিডেন্টের পাঁচ বছরের মেয়াদে বাজেটে মোট ১৪ হাজার কোটি ইউরো সাশ্রয় করতে চান। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি রাষ্ট্রীয় পেনশনব্যবস্থা নিয়েও প্রস্তাব দেবেন।

এদিকে, শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দো জেফ্রে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের একটি অনলাইন মতামত গ্রহণ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি তাদের অভাব-অভিযোগ ও দাবি জানাতে বলেছেন। এই কার্যক্রম ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেফ্রে লিখেছেন, ‘উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা, এবার তোমাদের বলার পালা। তোমাদের প্রতিটি বিদ্যালয়ের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা আমাদের জানাও।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘তোমাদের মতামত দিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি হবে। এতে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য আর বাস্তবায়নের বিস্তারিত সময়সূচি থাকবে; আর আমরা তোমাদের কাছে জবাবদিহি করব।’

শিক্ষাবিদদের মতে, ফ্রান্সে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের এত বড় পরিসরের সর্বশেষ দেশব্যাপী আন্দোলন হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে। পল ভালেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লেমেন্স কার্দোঁ-কাঁ, যিনি শিক্ষা খাতের অর্থায়ন নিয়ে গবেষণা করেন, বলেছেন যে তখন সরকার ব্যাকালরিয়া পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছিল; কিন্তু বিদ্যালয়গুলোকে যথেষ্ট বাড়তি সম্পদ দেয়নি। এর পরই ওই আন্দোলন শুরু হয়। ব্যাকালরিয়া হলো বিদ্যালয়জীবন শেষের পরীক্ষা, যা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পথ খোলে। ওই আন্দোলনের ফলে বরাদ্দ বেড়েছিল; কিন্তু বিদ্যালয়ের ওপর চাহিদা বাড়তে থাকলেও পরে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় আর বাড়েনি।

দেশজুড়ে চলা এ বিক্ষোভ ও অবরোধ এখন রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সরকারের জন্য এটি একটি স্পর্শকাতর সময়। গত সপ্তাহে সরকার ২০২৭ সালের বাজেটে ব্যয় কমানোর একগুচ্ছ পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে, যা জনগণের কাছে চরম অজনপ্রিয়। শিক্ষা খাতে বাজেট ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ৫৫৩ কোটি ইউরো হতে যাচ্ছে, তবে এ বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। এতে শিক্ষকদের পেনশন ধরা হয়নি। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) সদস্যদেশগুলোর মধ্যে শিক্ষা খাতে ব্যয়ের দিক থেকে ফ্রান্সের অবস্থান মাঝামাঝি। তবে গত এক দশকে দেশটিতে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয় খুব একটা বদলায়নি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে এ ব্যয় ছিল ১১ হাজার ৯১০ ইউরো, যা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৬৬০ ইউরোতে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

পাকিস্তানে নতুন প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনা, নেপথ্যে সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি

পাকিস্তানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) বিক্ষোভ নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই দেশটির…

26 minutes ago

নোয়াখালীর সেনবাগে নতুন গ্যাস কূপের সন্ধান, মিলতে পারে ৭০ লাখ ঘনফুট

নোয়াখালীর সেনবাগে সুন্দলপুর-৪ মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ খনন শেষে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাপেক্স জানিয়েছে,…

27 minutes ago

প্রবাসীদের স্বার্থে কাজ করবে সরকার, দালালদের নয়: প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী

দালালচক্র ও ট্রাভেল এজেন্সির অনিয়মের কারণে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে উল্লেখ করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক…

39 minutes ago

নেত্রকোনায় বিদ্যালয়ের সভায় স্ত্রীকে থাপ্পড় দিলেন শিক্ষক, ভিডিও ভাইরাল

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সভা চলাকালে সহকারী শিক্ষিকাকে থাপ্পড় মারার একটি ভিডিও ফেসবুকে…

43 minutes ago

গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান, আস্তানা গুঁড়িয়ে দিলেন ইশরাক হোসেন

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় চিহ্নিত মাদকের আস্তানায় ঝটিকা অভিযান চালিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। অভিযানে মাদক কারবারে…

58 minutes ago

ওসিকে হুমকি দিলেন নড়িয়া উপজেলা বিএনপি নেতা মতিউর রহমান

শরীয়তপুরের নড়িয়ায় নির্বাচনী বিলবোর্ড লাগানোকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি…

1 hour ago

This website uses cookies.