Header Premium (728×90)

Categories: রাজনীতি

পাকিস্তানে নতুন প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনা, নেপথ্যে সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি

পাকিস্তানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) বিক্ষোভ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা চলছে। কারাবন্দি ইমরান খানের প্রতি সমর্থন জানাতে দলটি বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। অন্যদিকে, পাক সরকারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে; রাজধানী ইসলামাবাদে প্রবেশের সড়কগুলো ২ হাজারের বেশি কনটেইনার দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার অনেকগুলোতে পেরেকও লাগানো হয়েছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর গত ৪ অক্টোবর পিটিআই খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের লাক্কি মারওয়াত থেকে প্রায় ৫ হাজার সমর্থক নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। ইসলামাবাদের দিকে আরও লোক যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও, তারা শেষ পর্যন্ত রাজধানীতে প্রবেশ করবে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে ইমরান খানকে ঘিরে এই রাজনৈতিক উত্তেজনার আড়ালে পাকিস্তানে ক্ষমতার আরেকটি বড় লড়াই চলছে। দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির নতুন প্রদেশ গঠনের মাধ্যমে পাকিস্তানের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে দ্য ইকনোমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি প্রশাসনিক সংস্কার মনে হলেও, এর বড় রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, এতে দীর্ঘদিন ধরে বংশপরম্পরায় রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখা দলগুলোর ক্ষমতার ঘাঁটি দুর্বল হতে পারে।

গত দুই বছরে পাকিস্তানের সংবিধান দুইবার সংশোধন করা হয়েছে। দেশটিতে নতুন ফেডারেল কন্সটিটিউশনাল কোর্ট (এফসিসি) গঠন করা হয়েছে, যা এখন সুপ্রিম কোর্টের চেয়েও বেশি ক্ষমতাশালী। গত সেপ্টেম্বরে পাক আদালত কার্যত ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের একটি রায় ঠেকিয়ে দেয়। দ্য ইকনোমিস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সেনাপ্রধান এরইমধ্যে বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর ওপরও নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছেন। এছাড়া, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগেও সেনাবাহিনীর প্রভাব রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকেও সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হিসেবে দেখা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভিকে পাক সেনাপ্রধানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পাকিস্তানের অর্থনীতি এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। ঋণ পরিশোধ ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পর সরকারের হাতে উন্নয়ন ও অন্যান্য খাতে ব্যয় করার মতো অর্থ কমে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সিনেটর ফয়সাল ভাওদার দাবি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেনাপ্রধানের অর্জনের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাফল্যের মিল নেই। তার ভাষায়, বর্তমান রাজনৈতিক শ্রেণি দেশকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

দেশটিতে নতুন প্রদেশ গঠনের বিতর্কের সূচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি। গত জুলাইয়ে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, পাকিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ‘ভেঙে পড়েছে’। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা ও ঋণের বোঝার কারণে বর্তমান গণতান্ত্রিক কাঠামো পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, চারটি বড় প্রদেশকে ছোট ছোট প্রদেশে ভাগ করাই হতে পারে সমাধান।

এই পরিকল্পনাটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে পাঞ্জাব ও সিন্ধে। পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল ও সমৃদ্ধ প্রদেশ পাঞ্জাবে দীর্ঘদিন ধরে শরিফ পরিবার ও তাদের দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) আধিপত্য। বর্তমানে প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ। অন্যদিকে, করাচিকে ঘিরে সিন্ধ প্রদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভুট্টো পরিবারের রাজনৈতিক ঘাঁটি। পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর পর তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো এই অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখেন। বর্তমানে দলটির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন তার স্বামী ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি। তাদের ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

দেশটিতে নতুন প্রদেশ গঠনের পক্ষে যুক্তি হলো, বর্তমান প্রদেশগুলো অত্যন্ত বড় এবং দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়েছে। পাঞ্জাবে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের বাস। ভূমি বিরোধের মতো সাধারণ সমস্যার সমাধানেও গ্রামাঞ্চলের মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হয়। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, প্রশাসনিক সংস্কারের আড়ালে মূল লক্ষ্য হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা কমানো। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতা ও সম্পদ কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা করছে বলে তাদের দাবি।

বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, কোনো প্রদেশ ভাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে বড় রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। সিন্ধ প্রাদেশিক পরিষদ ইতোমধ্যে সেপ্টেম্বরে প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাব পাস করেছে। তবে ফয়সাল ভাওদার দাবি করেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে জাতীয় গণভোট হতে পারে। এতে প্রাদেশিক পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। সমালোচকদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এমন গণভোট সেনাপ্রধানকে আরও শক্তিশালী নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ করে দিতে পারে। তবে পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। কারণ ইমরান খান কারাগারে থাকলেও তার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। পিটিআইয়ের কিছু নেতা মনে করছেন, সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে যে ফাটল তৈরি হচ্ছে, সেটিই তাদের জন্য নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

হরমুজ প্রণালিতে তেলের ট্যাংকারে হামলা, আহত ১১ ভারতীয় নাবিক

ওমানের উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে পানামার পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনায় ১১ জন ভারতীয়সহ…

22 seconds ago

বিয়ে নিয়ে নিজের ভাবনা জানালেন অভিনেত্রী কেয়া পায়েল

বিয়ে ও জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নিজের পছন্দের কথা জানালেন অভিনেত্রী কেয়া পায়েল। সম্প্রতি আরিফিন শুভর…

2 minutes ago

গাজায় নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে হাজারো ফিলিস্তিনি পরিবার

গাজায় যুদ্ধ শুরুর তিন বছর পরও নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে অপেক্ষা করছেন হাজারো ফিলিস্তিনি পরিবার। স্বাধীন…

3 minutes ago

জাপানের ভিসা নীতি: আতঙ্কিত না হয়ে নিয়ম মেনে চলাই জরুরি

জাপানের ভিসা ও অভিবাসন নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি…

6 minutes ago

ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা, নিন্দার ঝড়

ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্যে জুতার মালা পরানোর ঘটনায় স্থানীয়দের…

9 minutes ago

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সেপ্টেম্বর মাসের অভিযানে ১ কোটি টাকা জরিমানা

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সারাদেশে ১ হাজার ৩০৭টি খাদ্যস্থাপনায় অভিযান চালিয়ে…

20 minutes ago

This website uses cookies.