Header Premium (728×90)

চীনের অর্থনীতির রূপকার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজির পরলোকগমন

চীনের অর্থনীতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম পরাশক্তিতে রূপান্তরের মূল কারিগর, দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি মারা গেছেন। বুধবার (১২ আগস্ট) বেইজিংয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ১১টার দিকে বেইজিংয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

১৯৯০-এর দশকে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে আমূল পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশটিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে মূল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ঝু রংজি। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি তাকে একজন ক্ষুরধার বাকপটু ও সংস্কারক হিসেবে উল্লেখ করেছে, যার হাত ধরে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছিল। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চীনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেতা কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল মনোভাবকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করে তোলেন। এর ফলে লাখ লাখ কর্মী চাকরি হারালেও, এই সংস্কারই পরবর্তীতে ২০১০ সালে জাপানকে টপকে চীনকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত করতে ভূমিকা রাখে।

১৯২৮ সালের ২৩ অক্টোবর মাও সেতুংয়ের নিজ প্রদেশ হুনানে জন্মগ্রহণ করেন ঝু রংজি। অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও ১৯৫৭ সালে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়ার সংস্কারের প্রশংসা করার কারণে তাকে ‘ডানপন্থী’ আখ্যা দিয়ে দীর্ঘ ২২ বছরের জন্য নির্বাসনে পাঠানো হয়। ১৯৬৬-৭৬ সালের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাকে প্রত্যন্ত গ্রামে শারীরিক পরিশ্রমের সাজা ভোগ করতে হয়েছিল। তবে ১৯৭৯ সালে পুনর্বাসিত হওয়ার পর তিনি দ্রুত পদোন্নতি পান। ১৯৮৮ সালে সাংহাইয়ের মেয়র থাকাকালীন ১৯৮৯ সালের বিক্ষোভ দমনে সামরিক বাহিনী না ডেকে পরিমিতিবোধ ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে বেশ প্রশংসিত হন তিনি। ১৯৯১ সালে তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৯৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির স্থায়ী কমিটির সদস্য হন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি ও কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হন ঝু রংজি। তার কঠোর কাজের ধরনের জন্য তাকে ‘বস’ এবং ‘পাগলা ঝু’ নামে ডাকা হতো। ১৯৯৮ সালে তিনি এক ঐতিহাসিক বক্তব্যে বলেছিলেন, "আমি এখানে ১০০টি কফিন প্রস্তুত রেখেছি; ৯৯টি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য এবং একটি আমার নিজের জন্য।" উপ-প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়ে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছিলেন তিনি।

ডব্লিউটিওতে চীনের সদস্যপদ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াটি সহজ ছিল না। ১৯৯৯ সালে ওয়াশিংটনে বাজার উন্মুক্তকরণের প্রস্তাব নিয়ে গেলে ক্লিনটন প্রশাসন তা প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজ দেশেও তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তবে সব বাধা পেরিয়ে ২০০১ সালের ডিসেম্বরে চীনের ডব্লিউটিওতে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করেন তিনি। এছাড়া ১৯৯৮ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ফ্ল্যাট বিক্রির মাধ্যমে চীনে আবাসন খাতের ব্যক্তিগত মালিকানার জোয়ার এনেছিলেন তিনি। তবে তিনি পুরোপুরি বেসরকারীকরণের পক্ষে ছিলেন না, বরং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক কর্পোরেশনে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন।

চীনের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিজের ও সরকারের ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা করতেন না ঝু। ১৯৯৮ সালের বন্যায় ৪ হাজার ১৫০ জনের মৃত্যুর পর বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির কড়া সমালোচনা করে তিনি সেগুলোকে ‘সিমের বীজের গুঁড়ার’ চেয়েও দুর্বল বলেছিলেন। ২০০১ সালে একটি স্কুলে বিস্ফোরণে ৪২ জনের মৃত্যুর পর জাতীয় টিভিতে ক্ষমা চান তিনি। রসিকতা করতে ভালোবাসতেন এই নেতা; ১৯৯৯ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের ছবি দেখিয়ে রসিকতা করেছিলেন। উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অন্যতম বড় অর্জন ছিল কর সংস্কার, যা স্থানীয় রাজস্বের বড় অংশ বেইজিংয়ে জমা দিতে বাধ্য করেছিল। এ নিয়ে তিনি কৌতুক করে বলেছিলেন, এর জন্য তার অর্থনীতিতে নোবেল পাওয়া উচিত। অবসর গ্রহণের পর তিনি নিভৃত জীবনযাপন করছিলেন।

এসব পরিবর্তন ২০০০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চীনের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে নিয়ে যায়। আর ২০০৭ সালে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়।

১৯৮০-এর দশকে শুরু হওয়া দীর্ঘ আলোচনার পর ডব্লিউটিওর সদস্যপদ নিশ্চিত করার চীনা প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন ঝু। বৈশ্বিক বাণিজ্য সংস্থায় চীনের অন্তর্ভূক্তির এই মর্যাদা মুক্ত বাণিজ্যকে দেশটিতে জাতীয় অঙ্গীকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে; যা পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া বন্ধে স্থানীয় কর্মকর্তাদের বাধ্য করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন ঝু।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

শহিদ ডা. কবিরুলের মেয়ের এসএসসি সাফল্যে পাশে দাঁড়ালেন ডা. রফিকূল

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ডা. কবিরুল ইসলামের মেয়ে সাফওয়ানা ইসলাম পৌষীর এসএসসি পাসের…

8 minutes ago

পরিবর্তনহীন পুলিশ: এখনো ঘুস ও বদলি বাণিজ্যের পুরোনো বৃত্তেই

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশে নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও এখনো ঘুস, বদলি বাণিজ্য ও রাজনৈতিক…

9 minutes ago

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান শিল্পমন্ত্রীর

বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বিনিয়োগ…

18 minutes ago

ঘুষ না পেয়ে ঠিকাদারের হাত ভাঙার অভিযোগ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

ফরিদপুরের নগরকান্দায় ঘুষের টাকা দিতে অস্বীকার করায় এক ঠিকাদারকে মারধর করে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ…

18 minutes ago

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কোনো আপস নয়: নুরুন্নিসা সিদ্দিকা

রাজধানীর বারিধারায় 'অদম্য জুলাই' স্মারকের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর এমপি নুরুন্নিসা…

19 minutes ago

ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দুই সন্তানকে হাওরে ফেলে হত্যা, ঘাতক বাবা গ্রেপ্তার

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে পারিবারিক কলহের জেরে নিজের দুই শিশুসন্তানকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে হাওরের পানিতে ফেলে হত্যার…

25 minutes ago

This website uses cookies.