Header Premium (728×90)

১৬ ডিসেম্বর পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের দিন

মোঃ মকবুলার রহমান
নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:

আজ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর আজ বাঙালি জাতি উদ্‌যাপন করছে বিজয়ের ৫৫তম বার্ষিকী। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার নীল আকাশে মাথা তুলে দাঁড়ানোর এক গৌরবোজ্জ্বল দিন আজ। হাজার বছরের সংগ্রাম, শৌর্য, বীরত্ব ও আত্মত্যাগের চূড়ান্ত স্বীকৃতির দিন এটি।

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের বীজ থেকে শুরু করে ১৯৫২-এর রক্তাক্ত একুশ, ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭১ সালের টানা নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ—এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়েই আসে বিজয়। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি পায় চূড়ান্ত বিজয়। এই দিনেই বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ-এর।

জাতীয়ভাবে যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান বিজয় দিবস পালিত হচ্ছে। প্রত্যুষে ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক, মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণকারী আমন্ত্রিত ভারতীয় সেনা সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পৃথক বাণী প্রদান করেছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বিজয় দিবসকে জাতীয় গৌরবের প্রতীক এবং স্বাধীনতার চূড়ান্ত অর্জনের স্মারক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, সম্ভ্রমহারা মা-বোন ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন ছিল না; অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাও ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। তবে দীর্ঘ পথচলার পরও জনগণের পূর্ণ রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক মুক্তি এখনো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার বিজয় দিবসের বাণীতে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতার আলো বিভিন্ন সময়ে স্বৈরাচার ও অপশাসনের কারণে ম্লান হয়েছে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছে। তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি সুশাসিত ও উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলতে যে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সেই কর্মসূচি সফলতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

অধ্যাপক ইউনূস আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামীর বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনমুখী টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, এবারের বিজয় দিবস হোক জাতীয় জীবনে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপলক্ষ। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের যাত্রা শুরু হয়েছে, তা রক্ষার শপথ নেওয়ার দিন আজ।

প্রধান উপদেষ্টা ধর্ম-বর্ণ ও গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, শান্তিময় ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

মহান বিজয় দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আজ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করা হচ্ছে। দেশের ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির কামনায় বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল, কারাগার ও শিশু বিকাশ কেন্দ্রগুলোতে পরিবেশন করা হচ্ছে উন্নতমানের খাবার। একই সঙ্গে দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘর আজ বিনা টিকিটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে এবং সিনেমা হলে বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে।

এ ছাড়াও রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করছে।

editor

Recent Posts

সচিবালয়ে বড় রদবদল: বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব পেলেন কর্মকর্তারা

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জেতী প্রু স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে সচিবালয়ে বড় ধরনের রদবদল আনা হয়েছে। এতে বিভিন্ন…

17 minutes ago

মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন এবং নতুন সচিবালয়ের অনুমোদন

‘মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়’-এর নতুন নাম হতে যাচ্ছে ‘নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়’। পাশাপাশি রাজধানীর পল্টন…

20 minutes ago

মাঝআকাশে দরজা খুলে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের জরুরি অবতরণ, ঢাকায় রোগীর মৃত্যু

ভারতের আগরতলা থেকে কলকাতা যাওয়ার পথে মাঝআকাশে দরজা খুলে যাওয়ায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে…

40 minutes ago

আগামী ৭ জানুয়ারি শুরু অমর একুশে বইমেলা ২০২৭

আগামী ৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে অমর একুশে বইমেলা ২০২৭। ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাসব্যাপী এই…

1 hour ago

ওয়েবসাইট ও টেলিগ্রামে মাদক বিক্রি, ভাটারায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে অনলাইনে মাদক বিক্রির অভিযোগে এক শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার…

2 hours ago

প্যারিসে সহিংসতা ও অস্থিরতা: ২০২৭ নির্বাচন নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

প্যারিসের রাস্তায় চলমান সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং এর পেছনে…

2 hours ago

This website uses cookies.