ডেঙ্গুর প্রকোপ: ঢাকা উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে মৃত্যু প্রায় তিন গুণ
- আপডেট সময় : ১১:১৪:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে

চলতি বছরের শুরু থেকে দেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের তুলনায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। তবে এই পরিসংখ্যানের পেছনের বাস্তব চিত্র ভিন্ন দাবি করে দ্বিমত পোষণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কর্তৃপক্ষ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) পর্যন্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৬২ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৪৬ জনই মারা গেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়, আর বাকি ১৬ জন উত্তর সিটির বাসিন্দা। অর্থাৎ, উত্তরের তুলনায় দক্ষিণে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় তিন গুণ। শুধু মৃত্যু নয়, আক্রান্তের দিক থেকেও এগিয়ে রয়েছে দক্ষিণ সিটি। এ পর্যন্ত ডিএসসিসিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৮২৫ জন এবং ডিএনসিসিতে ৫ হাজার ৪২৩ জন।
সারাদেশের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭৫ জনে এবং মৃতের সংখ্যা ১৩০ জন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে দেশের বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ২৩ জন মারা গেছেন। এছাড়া ময়মনসিংহে ১৩ জন, বরিশালে ১১ জন, চট্টগ্রামে ৮ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৭ জন, রাজশাহীতে ৪ জন এবং রংপুর ও সিলেটে একজন করে মারা গেছেন।
আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তির ক্ষেত্রেও খুলনা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে, যেখানে ৭ হাজার ২৯৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৬ হাজার ৯৬৬ জন, বরিশালে ৬ হাজার ৮১১ জন, চট্টগ্রামে 6 হাজার ৭৭২ জন, রাজশাহীতে ২ হাজার ৫৫৭ জন, ময়মনসিংহে ২ হাজার ৪৯৯ জন, রংপুরে ১ হাজার ১৬৮ জন এবং সিলেটে ২০৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
তবে সরকারি এই পরিসংখ্যান মানতে নারাজ ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান। তিনি বলেন, ঢাকা উত্তর সিটির তুলনায় দক্ষিণে আক্রান্ত বা মৃত্যুর হার বেশি—এই তথ্যটি সঠিক নয়। দেশের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত। রাজধানীসহ সারাদেশের ডেঙ্গু রোগীরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন এবং তাদের সব তথ্য দক্ষিণ সিটির তালিকায় যুক্ত হয়। ফলে কাগজে-কলমে রোগীর সংখ্যা বেশি দেখালেও বাস্তবে দক্ষিণে রোগীর সংখ্যা বেশি নয়।
এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে তাদের নিয়মিত কার্যক্রম চলছে উল্লেখ করে ডা. জাহানে ফেরদৌস বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে আমাদের দুটি টিম সকালে ও বিকেলে কাজ করছে। একজন সুপারিভাইজারের অধীনে সকালে একটি টিম গিয়ে লার্ভা পরীক্ষা করে এবং লার্ভা পাওয়া গেলে বিকেলে অন্য টিম ওষুধ প্রয়োগ করে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট স্থাপনার মালিকদের সতর্ক করা হচ্ছে। এছাড়া অঞ্চলভিত্তিক মনিটরিং টিম মশক নিধন কর্মীদের উপস্থিতি ও কীটনাশকের সঠিক পরিমাণ যাচাই করছে।
ডেঙ্গুর বিস্তার ও মশার জীবনচক্র নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, দেশে ডেঙ্গুর বিস্তার এখন আর শুধু ঋতু পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তারতম্যে মশার প্রজনন মৌসুম দীর্ঘায়িত হয়েছে। হালকা বৃষ্টিপাত মশার প্রজননস্থল সচল করে এবং তাদের আয়ু বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত অনেক সময় লার্ভা ধ্বংস করে দেয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি পূর্ণাঙ্গ আবহাওয়াভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
মশার ঘনত্ব নিয়ন্ত্রণে তিনি ‘ব্রিডিং সোর্স ম্যানেজমেন্ট’ বা প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর জোর দেন। ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবনের পানির ট্যাংক ও ঘরের ভেতরের ড্রাম বা বালতিতে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার পরামর্শ দেন তিনি। যেসব স্থানে পানি জমতেই হবে, সেখানে কীটনাশক ব্যবহারের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, এই কাজে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে।
এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর (শনিবার) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। গত মঙ্গলবার এক সভায় প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় আগামী তিন মাসকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে এই কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শুধু মশক নিধনের ওপর নির্ভর না করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই কর্মসূচি মহানগর এলাকায় সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওরা সমন্বয় করবেন।





























