Header Premium (728×90)

টানা সাড়ে ৪ বছর ধরে কমছে প্রকৃত আয়, পুষ্টিঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ

টানা সাড়ে চার বছর ধরে দেশের মানুষের প্রকৃত আয় নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। প্রতি মাসে যে হারে দ্রব্যমূল্য বা মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, সাধারণ মানুষের মজুরি তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না। ফলে সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হু হু করে কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য এবং অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ থেকে এই উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই দেশের মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। ওই মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং গড় মজুরি হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপর থেকে টানা ৫৩ মাস ধরে মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। সর্বশেষ জুন মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে, বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর আগে মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ (2025) সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পরে অর্থাৎ আগের ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতির মধ্যে নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন দেওয়া শুরু হওয়ায় বাজারে আরেক দফা জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা সীমিত আয়ের বেসরকারি চাকরিজীবী ও মধ্যবিত্তদের আরও বিপাকে ফেলবে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীর আশপাশে একটি শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম মাসিক ব্যয় ২৫ হাজার টাকার বেশি। এর মধ্যে বাসাভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার, খাদ্য ১০ থেকে ১২ হাজার, শিক্ষা ২ থেকে ৩ হাজার, চিকিৎসা ১ থেকে ২ হাজার এবং যাতায়াত ও অন্যান্য খাতে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা। বর্তমান ন্যূনতম মজুরি দিয়ে এই মৌলিক চাহিদাগুলো মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে খাদ্যের খরচ কমাচ্ছেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের পুষ্টিবিদ সানজিদা শারমিন সতর্ক করে বলেন, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বাদ দিয়ে কেবল বেঁচে থাকার ন্যূনতম ক্যালরি গ্রহণ করার এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে। অপুষ্টির কারণে শ্রমিকদের শারীরিক সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমছে এবং শিশুরা মানসিক ও মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অবভাগের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় তারা মারাত্মক সংকটে পড়েছেন। মাছ, মাংস, ডিম ও ফলের মতো পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পেরে এসব পরিবার সস্তা ও কম পুষ্টিকর খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা নারী ও শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলায় সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মানুষ বিনোদন বা পর্যটনের মতো খাতে খরচ কাটছাঁট করায় ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার প্রভাবে বাজারে ও যাতায়াত-বাসাভাড়ায় যে খরচ বাড়বে, তা থেকে বেসরকারি খাতের মানুষকে বাঁচাতে সেখানেও বেতন বাড়ানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চাপ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্ডের সুবিধা যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বাজার সিন্ডিকেটসহ সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনায় তদারকি জোরদার করতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৮৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ কর্মজীবীর ৮৪ শতাংশ বা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত, যারা শ্রম আইনের সুরক্ষা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর বাইরে থাকেন। প্রাতিষ্ঠানিক খাতের চিত্রও সুখকর নয়; দেশের ১০২টি স্বীকৃত শিল্প খাতের মধ্যে মাত্র ৪৭টিতে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি কার্যকর রয়েছে।

এই অর্থনৈতিক সংকটের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের মুখে। কুড়িগ্রাম থেকে আসা আতাউর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে দিনমজুরের কাজ করে দিনে ৫০০ থেকে 600 টাকা আয় করেন। মহামারি করোনার পর থেকে চাল-ডালের দাম বাড়লেও তার আয় বাড়েনি। ফলে বাধ্য হয়ে মাছ, মাংস বা ডিম বাদ দিয়ে শুধু ভাত আর ডাল-সবজি খেয়ে দিন পার করছেন তিনি। কারওয়ান বাজারের আড়তকর্মী মকবুল হোসেনের অবস্থাও একই। সন্তানদের ভালো খাবারের আবদার মেটাতে না পেরে প্রতি মাসেই তাকে ধারদেনা করতে হচ্ছে। আবার বগুড়ার খেতমজুর সাইদুল ইসলাম জানান, কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় তার আয় আগের ১৫-২০ হাজার টাকা থেকে কমে এখন ১৪ হাজার টাকার নিচে নেমে গেছে। জমানো টাকা শেষ করে এখন ধারদেনার জালে জড়িয়ে পড়ছেন তিনি। অন্যদিকে, বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন রিয়াজ উদ্দিন। ২০২৪ (2024) ও ২০২৫ (2025) সালে তাঁর কোনো বেতন বাড়েনি। ২০২৬ (2026) সালে বেতন ৫ হাজার টাকা বেড়ে ৪৫ হাজার টাকা হয়েছে। তিন দফায় বাসাভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় সংসার চালাতে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

নেপালের অবকাঠামো ধ্বংস কেন বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে?

নেপালের পাহাড়ি এলাকায় গড় হিসাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি অবকাঠামো কেন চরম আবহাওয়ার মুখে বারবার…

13 minutes ago

হিমবাহধসের পর এবার ভূমিকম্পে কাঁপল তিব্বত

তিব্বতে ভয়াবহ হিমবাহধস ও বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।…

23 minutes ago

তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে সাউথ ব্লকের চাপ ও অস্বস্তি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দিল্লির সাউথ ব্লকের চাপ এবং তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা জোটকে…

26 minutes ago

বেসামরিক প্রশাসনে সামরিকীকরণ ও মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক

বেসামরিক প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর ব্যবহার এবং দেশের একমাত্র মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব কাঠামো নিয়ে বিতর্ক তৈরি…

29 minutes ago

সিলেটে ব্যবসায়ী শাহাবউদ্দিন হত্যায় রেস্টুরেন্ট কর্মচারী জালালের স্বীকারোক্তি

সিলেটের শাহপরানে প্রবীণ ব্যবসায়ী শাহাবউদ্দিনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যার রোমহর্ষক স্বীকারোক্তি দিয়েছে ঘাতক রেস্টুরেন্ট কর্মচারী জালাল…

1 hour ago

বেসিস নির্বাচন: ২৬ সেপ্টেম্বর ভোট, চূড়ান্ত তালিকা ৫ সেপ্টেম্বর

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের নির্বাচন ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।…

1 hour ago

This website uses cookies.