অ্যান কারসনের ভাবনায় প্রাচীন লেখা ও ভাঁজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অর্থ
- আপডেট সময় : ০৪:১০:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে

লিখনপদ্ধতি ও পাঠাভ্যাস যখন প্রথম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন থেকেই প্রাচীন যুগের মানুষ লেখার গভীরে গোপনীয়তা রক্ষার এক চমৎকার কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। মৌখিক সংস্কৃতির সমাজে যোগাযোগের সিংহভাগই প্রকাশ্যে ঘটত; যেমন কোনো দূত খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে যে বার্তা সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করতেন, তা কখনোই কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিঠির মতো ব্যক্তিগত ছিল না। শুরুর যুগের লেখক ও পাঠকেরা প্রকাশ্যে উচ্চারিত কথা এবং গোপনে লেখা বার্তার এই মৌলিক পার্থক্য সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। কবি স্যাফোকে আরোপিত এক প্রাচীন ধাঁধায় বিষয়টি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। ধাঁধাটিতে নারীসুলভ স্বভাবের একটি প্রাণীর কথা বলা হয়, যে তার গর্ভে অনাগত সন্তানদের আড়াল করে রাখে। সেই সন্তানদের নিজস্ব কোনো কণ্ঠ নেই, কিন্তু তারা সমুদ্র ও বিস্তীর্ণ প্রান্তর পেরিয়ে সুদূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, পাঠক যখন চিঠিটি পড়েন, তখন ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য কেউ তাদের সেই কথা শুনতে পান না। স্যাফো নিজেই ধাঁধার উত্তর দিয়ে জানান, সেই প্রাণীটি হলো চিঠি এবং গর্ভে থাকা সন্তানগুলো হলো বর্ণমালা বা অক্ষর।
চিঠি মূলত একজন অনুপস্থিত মানুষকে অন্যের সামনে উপস্থিত করে, তবে এই উপস্থিতি সকলের জন্য নয়। লেখক ও পাঠকের মধ্যে বিনিময় হওয়া চিঠি যেন এক গোপন সংকেত, যার অভ্যন্তরীণ অর্থে বাইরের কারোর প্রবেশাধিকার নেই। কবি আর্কিলোকোস নিজের কবিতার গোপন রূপক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পার্টানদের অনুসৃত ‘স্কিতালে’ নামের সংকেত ব্যবস্থার উদাহরণ টেনেছেন। প্রাচীন স্পার্টায় গোপন বার্তা পাঠাতে একটি নির্দিষ্ট মাপের দণ্ডের চারপাশে চামড়ার সরু ফিতা পেঁচিয়ে আড়াআড়িভাবে শব্দ লেখা হতো। ফিতাটি খুলে ফেললে অক্ষরগুলো এলোমেলো হয়ে যেত, কিন্তু প্রাপক একই আকারের দণ্ডে তা পুনরায় পেঁচিয়ে নিলে বার্তাটি আবার পাঠযোগ্য হয়ে উঠত। এখানে অর্থ কেবল বিচ্ছিন্ন শব্দের মধ্যে ছিল না, বরং শব্দ ও বিন্যাসের যৌথ মিলনে তা তৈরি হতো। লেখক ও পাঠককে যেন একই সংকেতের দুই অর্ধেক পূর্ণ করতে হতো, যেখানে বাইরের কারও যুক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল না।
যোগাযোগের এই গোপনতার ক্ষমতা নাট্যকার এস্কিলাসের ‘সাপ্লায়ান্টস’ নাটকেও দেখা যায়। নাটকে রাজা পেলাসগোস যখন জনগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে মুখে মুখে ঘোষণা করেন, তখন তিনি এর বিপরীতে গুটিয়ে রাখা, আড়াল করা ও সিলমোহর দেওয়া লিখিত দলিলের প্রসঙ্গ তোলেন। রাজা জানান, নগরবাসীর এই সিদ্ধান্ত দৃঢ়ভাবে নেওয়া হয়েছে এবং পেরেক ঠুকে স্থায়ী করা হয়েছে; কিন্তু তা কোনো ফলকে লেখা কিংবা বইয়ের ভাঁজে সিলমোহরে আটকে রাখা হয়নি। পেলাসগোসের মতে, লিখিত শব্দের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বা ভাঁজের ভেতরে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে, যা প্রকাশ্য মুক্ত কণ্ঠের যোগাযোগের বিপরীত।
তবে প্রাচীন বিশ্বে বই ও লেখার ফলক সত্যি সত্যিই ভাঁজ করে রাখা হতো। বার্তা লেখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল ‘দেলতোস’ নামক কাঠের ফলক, যা কবজার সাহায্যে বন্ধ করা যেত এবং ভেতরে মোমের আস্তরণে লেখা থাকত। লেখা শেষে ফলকটি বন্ধ করে দেওয়া হতো যেন তা অন্যের চোখে না পড়ে। একইভাবে দেবতাদের কাছে গোপন প্রশ্ন পাঠানোর ক্ষেত্রে ধাতুর ফলক ব্যবহৃত হতো। সপ্তম শতাব্দী খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে সক্রিয় ডোডোনার দৈববাণীর মন্দিরে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রায় দেড় শ সীসার ফলক উন্মোচন করেছেন, যেগুলোতে জিউসের কাছে করা নানা ব্যক্তিগত প্রশ্ন লেখা ছিল।
ডোডোনায় আবিষ্কৃত সীসার ফলকগুলোর হাতের লেখা, বানান ও ব্যাকরণের ভিন্নতা থেকে ধারণা করা হয় যে প্রশ্নকারীরা নিজেরাই ফিতার মতো লম্বাটে ফলকগুলোতে দুই থেকে চার লাইনে প্রশ্ন লিখে কয়েকবার ভাঁজ করে দিতেন। উল্টো পিঠে না লিখে ভেতরভাগে গোপন প্রশ্ন ঢেকে রাখার এই রীতি প্রমাণ করে যে, জিউসের কাছে প্রেরিত এই বার্তা পৃথিবীর অন্য কারোর জানার প্রয়োজন ছিল না। প্রাচীন পাঠকদের কাছে তাই ভাঁজ করা লেখা কেবল অলংকারিক কল্পনা নয়, বরং এক বাস্তব মাধ্যম ছিল। কাঠের ফলক বা গুটিয়ে রাখা সীসার ফিতা বহু দূরত্ব অতিক্রম করার পাশাপাশি বার্তাটি গোপনে আড়াল করে রাখত।
বস্তুগত এই রূপের বাইরে লেখার এক গভীর রূপক অর্থও রয়েছে। দৃশ্যমান শব্দের বাইরে এমন কিছু থাকে, যা পাঠককে নিজের পাঠ দিয়ে উন্মোচন করতে হয়। গ্রিক সাহিত্যে চিঠি লেখা ও পড়ার প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায় হোমারের ‘ইলিয়াড’-এর ষষ্ঠ সর্গে বর্ণিত বেলেরোফোনের কাহিনিতে। দৃশ্যমান বাক্যের নিচে скрыত এই দ্বিতীয় পাঠ রূপকের মাধ্যমে স্পষ্ট করে যে, কোনো লেখার আসল অর্থ পৃষ্ঠার ভাঁজের ভেতরেই উন্মোচনের অপেক্ষায় প্রচ্ছন্ন থাকে।





























