কেল্লাপোষী মেলা শেষ, কিন্তু প্রশ্ন আরও বড় হয়ে ফিরে এসেছ
- আপডেট সময় : ০৯:৩০:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে

ঐতিহ্য হারাচ্ছে কি শেরপুরের কেল্লাপোষী মেলা? অশ্লীলতা, জুয়া ও জবাবদিহির সংকটে একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা
মূল মেলা শেষ হয়েছে। দোকানপাট গুটিয়েছে, আলো নিভেছে, দর্শনার্থীর ভিড়ও কমে গেছে। কিন্তু বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোষী মেলাকে ঘিরে যে আলোচনা, প্রশ্ন এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছে—তা এখনও শেষ হয়নি।
প্রায় ৪৭০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মেলা শুধু একটি বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি শেরপুর অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মিলনমেলার প্রতীক। বছরের পর বছর এই মেলা গ্রামীণ ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, পারিবারিক বিনোদন এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে এসেছে।
জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও কেল্লাপোষী মেলার ঐতিহ্য, জামাইবরণ উৎসব এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
প্রশ্ন এখন ঐতিহ্য নিয়ে
মেলায় জুয়া বিরোধী অভিযানে পাঁচজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—এটি সংবাদে এসেছে এবং প্রশাসনের পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু একই সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে এবং উপস্থিত দর্শনার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ—মেলার কিছু অংশে সার্কাস ও বিভিন্ন প্রদর্শনীর নামে এমন কিছু কর্মকাণ্ড হয়েছে, যা একটি পারিবারিক ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই অভিযোগগুলো যদি সত্য না হয়, তাহলে তা পরিষ্কারভাবে খণ্ডন হওয়া প্রয়োজন। আর যদি অভিযোগের মধ্যে সত্যতার অংশ থাকে, তাহলে সেটি আরও বড় জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে।
কারণ একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা কখনোই এমন কোনো পরিবেশের জায়গা হতে পারে না, যা পরিবার নিয়ে উপস্থিত হওয়াকে অস্বস্তিকর করে তোলে।
জবাবদিহির প্রশ্ন এখন বড়
- মেলার ভেতরের সকল আয়োজন কি যথাযথভাবে মনিটর করা হয়েছিল?
- অনুমোদিত শর্ত অনুযায়ী অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে কি না?
- অভিযোগ ওঠার পর কতটা দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
- এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি রোধে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
একটি সভ্য সমাজে এসব প্রশ্নকে উপেক্ষা করা যায় না। কারণ নীরবতা অনেক সময় সমস্যাকে সমাধান না করে আরও গভীর করে তোলে।
ঐতিহ্য কি ধীরে ধীরে হারাচ্ছে?
কেল্লাপোষী মেলা একসময় পরিচিত ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতি, জামাইবরণ ঐতিহ্য, লোকজ বিনোদন এবং পারিবারিক আনন্দের জন্য। কিন্তু যদি জনমনে মেলা শেষ হওয়ার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সংস্কৃতি না হয়ে বিতর্ক হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই চিন্তার বিষয়।
সংস্কৃতি কখনো একদিনে নষ্ট হয় না। এটি ধীরে ধীরে বদলে যায়। আর সেই পরিবর্তন যদি অনিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে ঐতিহ্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।
সাংবাদিকতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
এই ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইভেন্টে সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি কোনো সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহের সময় বাধা, অপমান বা নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন—তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনস্বার্থে তথ্য পাওয়ার অধিকারের প্রশ্ন।
একটি স্বচ্ছ সমাজে সাংবাদিকদের কাজ বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। বরং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
আমরা কী চাই?
- সকল অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত
- মেলার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন রিপোর্ট
- ভবিষ্যতের জন্য কঠোর নিয়মনীতি
- ঐতিহ্য রক্ষায় কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ
কারণ একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা শুধু আয়োজন নয়—এটি একটি দায়িত্ব।
সমাপনী অনুচ্ছেদ
কেল্লাপোষী মেলা আমাদের ইতিহাস, আমাদের সংস্কৃতি এবং আমাদের পরিচয়ের অংশ। এই পরিচয় কোনোভাবেই বিতর্ক, অব্যবস্থাপনা বা নীরবতার মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে না।
আজ মেলা শেষ, কিন্তু প্রশ্ন শেষ হয়নি—বরং আরও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদি সত্যিই কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে সেটির তদন্ত হওয়া জরুরি। আর যদি না হয়ে থাকে, তাহলে জনমনে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
কারণ সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো অন্যায় নয়—বরং অন্যায় নিয়ে নীরবতা।
আজ কেল্লাপোষী মেলা একটি পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে—
ঐতিহ্য রক্ষা হবে, নাকি ধীরে ধীরে সেটি বিতর্কের ছায়ায় হারিয়ে যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দিতে হবে। কারণ আগামী বছর যদি একই প্রশ্ন আবার উঠে আসে, তাহলে সেটি আর শুধু একটি মেলার প্রশ্ন থাকবে না—সেটি হবে পুরো প্রশাসনিক ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন।
— মাহের আহমেদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক যখন সময়
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স
- কেল্লাপোষী মেলার ঐতিহ্য ও ইতিহাস বিষয়ে জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন
- জুয়া বিরোধী পুলিশি অভিযান সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন
- স্থানীয় দর্শনার্থী ও বাসিন্দাদের জনমত ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা
- প্রতিবেদকের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও সংগৃহীত ভিডিও/তথ্য উপাত্ত



























