Header Premium (728×90)

হুতি দমনে ইসরাইলের গোয়েন্দা সহায়তা চাইছে সৌদি আরব, নেপথ্যে সেন্টকম

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকি মোকাবিলায় সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের খবর সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় এই যোগাযোগ চলছে বলে সম্প্রতি ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমে জোর আলোচনা হচ্ছে। জানা গেছে, হুতিদের গতিবিধি ও হামলা ঠেকাতে ইসরাইলের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য চাইছে রিয়াদ। এই যোগাযোগের মাধ্যমে সৌদি আরব কি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের দিকে পা বাড়াচ্ছে—সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

হুতিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের হাতে থাকা আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রিয়াদের জ্বালানি অবকাঠামো এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এটি সৌদি আরবের সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি দেশটিকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতিতে হুতি ও ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর ওপর দীর্ঘদিনের নজরদারির অভিজ্ঞতা থাকা ইসরাইলের গোয়েন্দা সক্ষমতা রিয়াদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে উঠেছে। স্যাটেলাইট নজরদারি, সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স এবং লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরে সেনা চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণ করে ইসরাইল সৌদি আরবকে সহায়তা করতে পারে। তবে এই সহায়তার বিপরীতে রিয়াদকে কী মূল্য দিতে হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতার বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হয়। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছে হুতিদের অবস্থানে সরাসরি সামরিক হামলার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপে রাজি হননি। এর পরিবর্তে তিনি গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। যুবরাজের সঙ্গে সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের বৈঠকের বিষয়টি সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও নিশ্চিত করেছে। ওয়াশিংটন গোয়েন্দা সহায়তা দিতে প্রস্তুত হলেও ইয়েমেনে নতুন কোনো সামরিক অভিযানের মূল দায় নিজেদের কাঁধে নিতে চাচ্ছে না।

এতদিন পর্যন্ত সৌদি আরব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখে আসছিল। তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রাখছিল, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথও খোলা রেখেছিল। একই সময়ে রিয়াদ সরাসরি ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো এড়িয়ে গেছে এবং তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে। কিন্তু ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক বা গোয়েন্দা সহযোগিতা এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে। তেহরান এই সহযোগিতাকে কেবল হুতিদের বিরুদ্ধে কারিগরি সহায়তা হিসেবে দেখবে না, বরং এটিকে সৌদি আরবের ইরানবিরোধী জোটে যোগ দেওয়ার প্রকাশ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করবে।

সৌদি আরবের জন্য ঝুঁকি কেবল ইরানের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফিলিস্তিন ইস্যু অমীমাংসিত রেখে ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। রাজনৈতিক সমাধানের আগে কেন এই সামরিক ঘনিষ্ঠতা—রিয়াদকে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এই জটিল পরিস্থিতিতে সেন্টকমের মধ্যস্থতা একটি রাজনৈতিক বাফার বা ঢাল হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে সৌদি আরব সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সামরিক সম্পর্কের কথা স্বীকার না করেই প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য পেতে পারছে। অন্যদিকে, ইসরাইলও আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি ছাড়াই তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছে।

ইসরাইলের জন্য এই পরিস্থিতি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক। আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের আগেই তারা সৌদি আরবকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয়ের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে। এর মাধ্যমে পশ্চিম জেরুজালেম প্রমাণ করতে পারছে যে, ইরানের হুমকি মোকাবিলায় আরব দেশগুলোর জন্য তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা কতটা অপরিহার্য। ফলে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব নিরাপত্তার বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।

হুতিদের অব্যাহত হামলা ও নতুন আশঙ্কার মুখে সৌদি আরব এখন অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি। রিয়াদকে হয় একা ইয়েমেনের সঙ্গে একটি অনিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে হবে, নয়তো সক্ষম কোনো পক্ষের সাহায্য নিতে হবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে নারাজ, যুক্তরাজ্যের ভূমিকা কেবল সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং সৌদি আরবের আঞ্চলিক অংশীদাররাও ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না। এমনকি গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও এখন পর্যন্ত হুতিদের দমনে কোনো কাজে আসেনি। এই পরিস্থিতিতে হুতিদের অবকাঠামো ও হামলার প্রস্তুতি সম্পর্কে কার্যকর তথ্য দেওয়ার সক্ষমতা একমাত্র ইসরাইলেরই রয়েছে। এই তথ্য যদি সৌদি সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়, তবে তা দুই দেশের মধ্যে প্রথম কার্যকর সামরিক-গোয়েন্দা সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করবে।

রিয়াদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, তেহরান সম্ভবত হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ইরানকে নিয়ন্ত্রণে ইসরাইলি কৌশলের মধ্যে কোনো পার্থক্য করবে না। ইরান এটিকে শত্রুভাবাপন্ন জোট হিসেবে গণ্য করলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বন্দর, ট্যাংকার চলাচলের পথ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে। যদি এই গোয়েন্দা যোগাযোগ স্থায়ী রূপ নেয় এবং হুতিদের ছাড়িয়ে সামগ্রিক ইরান বিরোধিতায় রূপ নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা পাবে। তখন লোহিত সাগর, লেবানন বা ইয়েমেনের আলাদা আলাদা ফ্রন্ট একীভূত হয়ে দুটি স্পষ্ট আঞ্চলিক ব্লকের মুখোমুখি সংঘাত শুরু হবে। একদিকে থাকবে ইসরাইল, সৌদি আরব ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা; অন্যদিকে থাকবে ইরান ও তার সহযোগী শক্তিগুলো।

যদিও এক দশক আগেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক কল্পনা করা কঠিন ছিল, আজ তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তবে সৌদি আরব এখনই ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সঙ্গে কোনো স্থায়ী জোটে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমনটা ভাবা ভুল হবে। রিয়াদ সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদি কোনো অঙ্গীকার ছাড়াই কেবল হুতিদের তাৎক্ষণিক হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন, ব্রিটিশ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা তথ্যের সাহায্য নিতে চাইছে। তারা কোনোভাবেই অন্য কারও যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পরিণত হতে চায় না। তবে দীর্ঘ সময় পর সৌদি আরব এমন একটি সীমারেখার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা পার হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণমাত্রার আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে।

একদিকে থাকবে ইসরাইল, সৌদি আরব এবং তাদের সমর্থনকারী পশ্চিমা দেশগুলো। অন্যদিকে থাকবে ইরান ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলো। এ কারণেই বর্তমান যোগাযোগ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের আরেকটি ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এগুলো পুরো আঞ্চলিক সংঘাতের গতিপথ বদলে দিতে পারে। কারণ ১০ বছর আগেও মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বিশেষজ্ঞই সংযুক্ত আরব আম

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান কখনো মাথা নত করবে না: পেজেশকিয়ান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা…

13 minutes ago

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিরসনে নতুন আশাবাদ, নিউইয়র্কে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। এই আলোচনার পর…

16 minutes ago

ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন…

42 minutes ago

নিউইয়র্কে মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রাতরাশ বৈঠক

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন…

1 hour ago

ডেঙ্গু ও হাম প্রতিরোধে ব্যর্থতার সুযোগ নেই: রুহুল আমিন হাওলাদার

ডেঙ্গু ও হামে মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ বি এম…

1 hour ago

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে পাঁচ দফা প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর

নিউইয়র্কে আয়োজিত জাতিসংঘের এক বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক…

1 hour ago

This website uses cookies.