Header Premium (728×90)

নতুন বাংলাদেশ গড়তে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তর জরুরি

২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এই বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়েছে। রাজপথে তরুণ সমাজের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে শুধু এক ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানই ঘটেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল রূপান্তরের ঐতিহাসিক দায়িত্ব তাদের কাঁধে এসেছে। তবে যে তরুণদের রক্তের বিনিময়ে এই নতুন বন্দোবস্তের সুযোগ তৈরি হলো, তাদের সেই স্বপ্নের ভিত্তি মজবুত করতে হলে হাত দিতে হবে জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত—শিক্ষাব্যবস্থায়। রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার যদি বিপ্লবের প্রথম পর্ব হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক পুনর্গঠনই হলো রাষ্ট্র টেকসই করার দ্বিতীয় ও প্রধানতম লড়াই।

বিগত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এক গভীর কাঠামোগত পঙ্গুত্বের মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা পরিণত হয়েছিল শুধু সনদ সর্বস্ব, মুখস্থনির্ভর এবং বৈশ্বিক কর্মবাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক প্রক্রিয়ায়। ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৬ শতাংশ অথবা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আমাদের শিক্ষা বাজেট বছরের পর বছর ধরে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশের ঘরে আটকে ছিল। যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ২ শতাংশে উন্নীত করা হয়, তবুও এটি দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট’-এ বারবার এই বাজেট সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। এই বরাদ্দের বড় অংশই আবার চলে যায় অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যয়ে, যা উদ্ভাবন বা গবেষণায় কোনো অবদান রাখে না।

শিক্ষা খাতের এই গুণগত দেউলিয়াত্বের ফল দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের তুলনায় উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ডিগ্রিধারীদের এক বিরাট অংশই স্নাতকোত্তর শেষ করার পর দীর্ঘকাল উপযুক্ত কর্মসংস্থান পান না। এর মূল কারণ শিল্প খাতের বাস্তব চাহিদা এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের মধ্যকার পর্বতসম ব্যবধান। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিকস ও বিশ্বমানের দক্ষতার যুগে আমাদের শ্রেণিকক্ষগুলো এখনো দুই দশক আগের সিলেবাস আঁকড়ে ধরে আছে।

শিক্ষার এই নিম্নমানের প্রতিফলন ঘটছে বৈশ্বিক মূল্যায়নেও। কোয়াকুয়ারেলি সিমনডস (কিউএস) বা টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ বা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুপস্থিতি এখন নিয়মিত চিত্র। গবেষণার অভাব এবং তার চেয়েও বড় কথা—শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধার পরিবর্তে নগ্ন রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়াই এই পতনের মূল কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করা হয়েছিল শাসকদলের পেশিশক্তি চর্চার আখড়ায়। দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির তাণ্ডবে ছাত্র সংসদগুলো অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা ও স্বাভাবিক নেতৃত্ব বিকাশকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে।

এর পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বুনিয়াদও চরম হোঁচট খেয়েছে। বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন, অপরিকল্পিত পরীক্ষা পদ্ধতি চালু এবং পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক তৈরির ঘাটতির কারণে শিক্ষার মৌলিক মানই ধ্বংস হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে শেখার চেয়ে কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছে, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে এক ধরনের চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেছে। গ্রামের সাধারণ প্রান্তিক পরিবারের সন্তানটি আজ শহরের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শুরুতেই পিছিয়ে পড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তরুণ প্রজন্মের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো—মেধাকেন্দ্রিক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র পরিচালনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই তরুণরা কোনো খণ্ডিত সমাধান চায় না; তারা চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যোগ্যতার সঠিক মর্যাদা। পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ রাষ্ট্রের সর্বস্তরে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং দলীয় পরিচয়ভিত্তিক স্বজনপ্রীতি চিরতরে বন্ধ করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।

দ্বিতীয়ত, তরুণ সমাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতির অবসান চায়। তবে এর অর্থ রাজনীতিবিমুখতা নয়; SARS তারা চায় সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত বিরতিতে ছাত্র সংসদ (যেমন—ডাকসু, জাকসু, রাকসু ইত্যাদি) নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাডারভিত্তিক গণরুম, গেস্টরুমের নামে দখলদারিত্বের বদলে ছাত্র সংসদই হবে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়, মুক্তচিন্তার চর্চা এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির একমাত্র স্বীকৃত প্ল্যাটফর্ম।

একইভাবে ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচার রোধ করাও আজকের দিনে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর হাজার হাজার মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছাড়ছে এবং তারা আর ফিরছে না। এর একমাত্র কারণ দেশে তাদের মেধার মূল্যায়ন নেই, নেই গবেষণার পর্যাপ্ত পরিবেশ। এই মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে না পারলে ২০৪১ সালের উন্নত বা স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন শুধু কাগজ-কলমেই থেকে যাবে।

শিক্ষাব্যবস্থার টেকসই পুনর্গঠনে এখন কয়েকটি জরুরি নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য—

পাঠ্যক্রম সংস্কার ও কারিগরি শিক্ষা: সাধারণ তত্ত্বনির্ভর শিক্ষার বাইরে মাধ্যমিক স্তর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, কোডিং, প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা-দক্ষতা ও ব্যবহারিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্রতি তিন বছর পরপর সিলেবাস হালনাগাদ করা আবশ্যক।স্বাধীন জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন: শিক্ষক নিয়োগে দলীয় প্রভাব ও আর্থিক দুর্নীতি বন্ধে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ বা ‘শিক্ষক নিয়োগ কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে, যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে শুধু মেধার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেবে।গবেষণায় বাজেট ও ইনকিউবেশন: শিক্ষায় জিডিপির অন্তত ৩-৪ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল গঠনের পাশাপাশি তরুণদের উদ্যোক্তা বানাতে স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সেন্টার এবং জামানতহীন সহজ শর্তে ঋণের আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বৈষম্য দূরীকরণ: কোচিংনির্ভরতা কমাতে শ্রেণিকক্ষেই পড়াশোনা নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে যোগ্য ও উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ত্বরান্বিত করতে হবে।শিক্ষা কোনো অনুদান নয়, এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। একটি মেরুদণ্ডহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে কোনো শক্তিশালী বাংলাদেশ গঠন সম্ভব নয়। ২০২৪-এর তরুণ প্রজন্ম তাদের দায়িত্ব পালন করেছে—তারা পরিবর্তনের নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এখন রাষ্ট্র ও নীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দায়িত্ব হলো তরুণদের এই আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা। যে শিক্ষা তরুণকে দাসত্ব নয়, বরং স্বাধীন চিন্তা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের প্রেরণা জোগায়—সেই শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তনই হোক নতুন বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

মাদারগঞ্জে অনিয়মের দায়ে দুই ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী বাজারে অনিয়মের অভিযোগে দুই ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ…

3 hours ago

নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক এমপি মোশতাক আহমেদ রুহী গ্রেপ্তার

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের একটি বাসা থেকে নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহীকে…

3 hours ago

নিউ ইয়র্কে নামছে না নেতানিয়াহুর উড়োজাহাজ

যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করছেন না ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন…

4 hours ago

মূল্যস্ফীতির চাপে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

সার্বিক মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী প্রবণতায় থাকলেও তা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার বেশি হওয়ায় নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে…

4 hours ago

টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করতে নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করতে বিদেশি ট্রেডিং পার্টনার ব্যাংকের নামে প্রারম্ভিক জমা ছাড়াই টাকা ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট…

4 hours ago

পাকিস্তান–চীন নতুন সীমান্ত চুক্তি নিয়ে ভারতের তীব্র প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন সীমান্ত চুক্তিকে আইনি ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। বিতর্কিত…

4 hours ago

This website uses cookies.