Header Premium (728×90)

জলবায়ু সংকট মোকাবিলা ও অস্তিত্ব রক্ষায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের তাগিদ

সভ্যতা ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ প্রকৃতির বুক থেকে সবুজকে উচ্ছেদ করে কংক্রিটের দেয়াল গড়ে তুলছে। অথচ মানুষের জীবনধারণ, অক্সিজেন, খাদ্য ও সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা অনস্বীকার্য। বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, বন্যা এবং তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বৃক্ষরোপণকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হিসেবে না দেখে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) ২০২০ সালের বৈশ্বিক বনসম্পদ মূল্যায়ন অনুযায়ী, পৃথিবীর মোট স্থলভাগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ৪.০৬ বিলিয়ন হেক্টর এলাকা বনভূমি। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭৮ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি বিলীন হয়ে গেছে। যদিও বনায়ন ও প্রাকৃতিক পুনরুদ্ধারের কারণে বনের ক্ষয় কিছুটা কমেছে, তবুও এই বিশাল বন উজাড়ের ফলে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব আরও বেশি সংবেদনশীল। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের মোট ভৌগোলিক এলাকার মাত্র ১৬.৮৮ শতাংশ বৃক্ষ আচ্ছাদিত। একই সঙ্গে দেশের প্রাকৃতিক শালবন ও পাহাড়ি বনের বড় অংশই ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে আবাসন, শিল্প ও অবকাঠামো নির্মাণের চাপে বনভূমি ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। ফলে নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান প্রাকৃতিক বন রক্ষা ও শহরের সবুজায়ন বাড়ানো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গাছ অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনইপি) জানায়, বনের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার বায়ুমণ্ডলের গ্রিনহাউস গ্যাস শোষণ করে জলবায়ু প্রশমনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরের কংক্রিট ও পিচঢালা রাস্তা যে তাপ ধরে রাখে, পর্যাপ্ত গাছপালা থাকলে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে সেই তাপমাত্রা প্রাকৃতিকভাবেই নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাই নগরের তীব্র গরম থেকে বাঁচতে নগর বৃক্ষায়নকে জনস্বাস্থ্যের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা দরকার।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতেও বনের ভূমিকা অপরিসীম। গাছের শিকড় মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ বাড়াতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যুহ হিসেবে কাজ করে, যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা থেকে দেশকে রক্ষা করে। উপকূলীয় এলাকায় পরিকল্পিতভাবে ম্যানগ্রোভ বনায়ন করা হলে তা জলবায়ু অভিযোজন কৌশলে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষায় বৃক্ষরোপণের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব অনেক বেশি। কৃষিজমির পাশে পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় উপযোগী ও ফলদ গাছ লাগালে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং কৃষকের অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। ইউএনইপি-এর ২০২৫ সালের একটি মূল্যায়ন অনুযায়ী, উষ্ণমণ্ডলীয় বন সংরক্ষণ পানি, মাটি, পরাগায়ন ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা সচল রাখতে সাহায্য করে। একটি গাছ কাটার অর্থ হলো তার ওপর নির্ভরশীল পাখি, কীটপতঙ্গ ও অণুজীবের তৈরি করা একটি ক্ষুদ্র বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করা। তাই দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ করে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আবশ্যক।

তবে বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো উৎসবকেন্দ্রিকতা। বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ চারা রোপণ করা হলেও পরিচর্যা ও সুরক্ষার অভাবে অধিকাংশ চারা মারা যায়। এ কারণে কেবল গাছ লাগানোই শেষ কথা নয়, বরং 'গাছ লাগাব, গাছ বাঁচাব' স্লোগানকে সামনে রেখে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। নদীর তীর, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উপকূলীয় অঞ্চলের মাটির ধরন বুঝে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সঠিক প্রজাতির গাছ নির্বাচন করা জরুরি।

আন্তর্জাতিকভাবেও পরিবেশ পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের নেতৃত্বে ২০২১-২০৩০ সময়কালকে 'প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের দশক' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইউএনইপি-এর তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫০ মিলিয়ন হেক্টর অবক্ষয়িত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলে প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাস্তুতান্ত্রিক সেবা পাওয়া যাবে এবং বায়ুমণ্ডল থেকে ১৩ থেকে ২৬ গিগাটন গ্রিনহাউস গ্যাস অপসারিত হবে।

বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণ অভিযানকে সফল করতে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট গাছের দায়িত্ব দেওয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে গাছ কাটার বিকল্প নকশা খোঁজা প্রয়োজন। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কতটি গাছ রোপণ করা হলো, তার পাশাপাশি কতটি গাছ বেঁচে রয়েছে তার বার্ষিক হিসাব প্রকাশ করা উচিত। সর্বোপরি, জন্মদিন, বিয়ে বা যেকোনো বিশেষ অর্জনকে স্মরণীয় করে রাখতে গাছ লাগানোর সংস্কৃতি গড়ে তুললে তা মানুষের আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

গাড়িতে হামলার ঘটনায় জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আল্টিমেটাম

কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের…

5 minutes ago

অস্ট্রেলিয়ায় ঐতিহাসিক জয়ের পর নাজমুলদের ফোন প্রধানমন্ত্রীর

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের…

20 minutes ago

অনুকূল পরিবেশ না হলে ভারত সফরে যাবেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের প্রত্যর্পণসহ…

26 minutes ago

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া…

37 minutes ago

ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত: চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় দেশটিতে সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা…

45 minutes ago

বর্ষায় পায়ের সুরক্ষায় করণীয় ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা

বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় পায়ের চর্মরোগের ঝুঁকি এড়াতে এবং পা সুস্থ রাখতে প্রয়োজনীয় কিছু ঘরোয়া যত্ন…

47 minutes ago

This website uses cookies.