Header Premium (728×90)

Categories: জাতীয়

কুমিল্লার পাড়া-মহল্লায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, টিকটকের আড়ালে খুন ও অস্ত্রের মহড়া

কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় টিকটক ভিডিও তৈরি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আড়ালে বেপরোয়া হয়ে উঠছে একাধিক ‘কিশোর গ্যাং’। দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্য মহড়া, মাদক কারবার, ছিনতাই থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এসব দলের সদস্যরা। সম্প্রতি ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া ও হত্যার ঘটনার পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লায় বর্তমানে অন্তত ২০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম এসেছে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনও একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। টিকটকের জন্য ভিডিও তৈরির আড়ালে অন্য কিশোরদের নিজের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা ছিল তাঁর। এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া অন্য কিশোরদের একজন তার সৌদিপ্রবাসী বাবার পাঠানো টাকা দিয়ে আইফোন কিনে নিয়মিত টিকটক ভিডিও বানাত। অন্য একজন কিনেছিল মোটরসাইকেল, যা দিয়ে সে তুহিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়।

অপ্রতিম হত্যার প্রতিবাদে এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল ও বিক্ষোভ করেছেন। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, অপ্রতিমের মা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম যখন সহকারী প্রক্টর ছিলেন, তখন মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকে তাঁর একমাত্র সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তাঁরা।

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের এই তৎপরতা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। ২০১৫ সালের দিকে নগরে প্রথম ৩-৪টি দল সক্রিয় হওয়ার মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ২০২২ সালের দিকে এই সংখ্যা দাঁড়ায় কমপক্ষে ২০টিতে। তখন রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, ইগল, আরজিএস, র‍্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমসি, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ ও বসের মতো গ্রুপগুলো বেশ আলোচিত ছিল। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে এসব গ্যাংয়ের নাম জড়ায়। বর্তমানে কিং স্কোয়াড, রতন গ্রুপ বা স্কোয়াড, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপ নামের পাঁচটি গ্রুপ কুমিল্লা শহরে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এর বাইরে অপু ও সাব্বির নামের দুটি উপ-গ্রুপও রয়েছে।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন সময় রাজপথে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে জনমনে চরম আতঙ্ক তৈরি করছে। গত মে মাসের এক বিকেলে গোমতী নদীর তীরের ভাটারপুকুর থেকে কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ এলাকা পর্যন্ত ১০০ থেকে ১৫০ জন কিশোর ও তরুণ রামদা, চাপাতি ও লাঠি নিয়ে মহড়া দেয়। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, ওই কিশোর দলটির নাম ‘ক্রাইম সেটআপ’। এছাড়া ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার দিন রানীর দিঘির পাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় এবং বাজি ফুটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে কিশোরদের দল।

পুলিশের নথিতে দেখা গেছে, এই গ্যাংগুলোর সদস্যরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়ায়। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ধর্মসাগরপারের রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময় নামের এক তরুণকে রতন গ্রুপের সদস্যরা কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে, যাতে তাঁর একটি হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর দুই দিন পর যৌথ অভিযানে দুর্গাপুর ও রেসকোর্স এলাকা থেকে পিস্তল, রিভলভার, গুলি ও মাদকসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে অশোকতলায় সজীব হোসেন ওরফে বাবু নামের এক সুপারশপ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, যার নেপথ্যে ছিল কিশোর গ্যাংয়ের মাদক কারবারের বিরোধ। একই বছরের ২৫ জুন কাঁটাবিল এলাকায় অপু গ্রুপ ও সাব্বির গ্রুপের সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় ইথান আহমেদ নামের ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, গত বছরের ৩০ নভেম্বর তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বয়স কম হওয়ায় অনেকেই দ্রুত জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবাকে ডেকে মুচলেকা নেওয়া হলেও শুধু পুলিশের তৎপরতা দিয়ে এই অপরাধ দমন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কিশোর গ্যাংয়ের এই বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা (টিপু) বলেন, কুমিল্লায় বর্তমানে এমন কোনো পাড়ামহল্লা নেই যেখানে কিশোর গ্যাং নেই। বিগত সময়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের মাধ্যমে এদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছিল। এদের এখনই থামাতে হবে। সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা এই কিশোরেরা ভবিষ্যতে আরও বড় সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্কতার পাশাপাশি পরিবারকেও সন্তানের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখতে হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

বনশ্রীতে কুকুরকে খাওয়াতে গিয়ে তরুণীকে মারধর, থানায় অভিযোগ

রাজধানীর বনশ্রীতে পথকুকুরকে খাবার দিতে গিয়ে স্থানীয়দের হামলার শিকার হয়েছেন এক তরুণী। গত মঙ্গলবার রাতে…

1 minute ago

ঈশ্বরদীতে ক্রেতা সেজে দুই ভরি স্বর্ণের মালা নিয়ে চম্পট

পাবনার ঈশ্বরদীতে ক্রেতার পরিচয়ে দোকানে ঢুকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা মূল্যের দুই ভরি স্বর্ণের মালা…

27 minutes ago

গোপালগঞ্জে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মাঝে দুই লাখ টাকার অনুদানের…

36 minutes ago

ইবির আইন অনুষদের ১৯ শিক্ষার্থী সিভিল জজ পদে মনোনীত

অষ্টাদশ বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আইন অনুষদ থেকে ১৯…

48 minutes ago

নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান কখনো মাথা নত করবে না: পেজেশকিয়ান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা…

1 hour ago

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিরসনে নতুন আশাবাদ, নিউইয়র্কে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। এই আলোচনার পর…

1 hour ago

This website uses cookies.