১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। সেদিন মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ২৫৮–১৭৬ ভোটে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিশংসন তদন্তের প্রস্তাব পাস হয়। রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই পরিষদে ডেমোক্র্যাট দলেরও ৩১ জন সদস্য এই তদন্তের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। মূলত হোয়াইট হাউসের সাবেক ইন্টার্ন মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে ক্লিনটনের গোপন সম্পর্ক এবং পরবর্তীতে সত্য গোপনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ অভিশংসন অনুসন্ধান।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৫ সালের জুনে, যখন ২১ বছর বয়সী মনিকা লিউনস্কি হোয়াইট হাউসে অবৈতনিক ইন্টার্ন হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে যে, সে বছরের নভেম্বর থেকেই ক্লিনটনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালে মনিকাকে পেন্টাগনে বদলি করা হলে সেখানে সরকারি কর্মচারী লিন্ডা ট্রিপের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। মনিকা তাঁর বিশ্বাসের জায়গা থেকে লিন্ডাকে এই সম্পর্কের কথা জানান। কিন্তু লিন্ডা গোপনে তাঁদের ফোনালাপ রেকর্ড করতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে এই কেলেঙ্কারিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেয়।
একই সময়ে আরকানসাসের সাবেক সরকারি কর্মচারী পলা জোনস ১৯৯১ সালের মে মাসে আরকানসাসের গভর্নর থাকাকালীন ক্লিনটনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলার আইনজীবীরা যখন ক্লিনটনের অন্যান্য সম্পর্কের খোঁজ করছিলেন, তখন মনিকার নাম সামনে আসে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে মনিকাকে আদালতে তলব করা হলে ১৯৯৮ সালের জানুয়ারিতে এক হলফনামায় তিনি ক্লিনটনের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করেন। এমনকি ১৭ জানুয়ারি শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ক্লিনটন নিজেও মনিকার সঙ্গে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন। ২৬ জানুয়ারি ক্লিনটন জনসমক্ষে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, "মনিকার সঙ্গে আমার কোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক ছিল না এবং আমি কাউকে মিথ্যা বলতে বলিনি।"
কিন্তু লিন্ডা ট্রিপের রেকর্ড করা ফোনালাপ তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৯৮ সালের ১২ জানুয়ারি লিন্ডা স্বাধীন কৌঁসুলি কেনেথ স্টারের দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যিনি তখন ক্লিনটন দম্পতির ‘হোয়াইটওয়াটার’ রিয়েল এস্টেট ব্যবসা নিয়ে তদন্ত করছিলেন। লিন্ডার তথ্যের ভিত্তিতে ১৬ জানুয়ারি স্টারের তদন্তের পরিধি বাড়ানো হয়। মনিকা লিউনস্কির চাকরি পাওয়ার চেষ্টা, ক্লিনটনের ব্যক্তিগত সচিব বেটি কারির ভূমিকা, উপহার সরানো বা পলা জোনস মামলায় সাক্ষ্য প্রভাবিত করার চেষ্টার মতো বিষয়গুলো কেনেথ স্টারের তদন্তের পরিধিতে চলে আসে। এই তদন্তে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায় মনিকার একটি গাঢ় নীল রঙের পোশাক। মনিকা লিন্ডাকে জানিয়েছিলেন যে, ক্লিনটনের সঙ্গে একটি ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের সময় তাঁর পরনে থাকা ওই পোশাকে দাগ লেগেছিল। লিন্ডা তাঁকে পোশাকটি না ধোয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে এফবিআই সেই পোশাকের দাগের ডিএনএ পরীক্ষা করে ক্লিনটনের রক্তের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পায়।
অকাট্য প্রমাণের মুখে ১৯৯৮ সালের ১৭ আগস্ট ক্লিনটন গ্র্যান্ড জুরির সামনে সাক্ষ্য দেন এবং ওই রাতেই টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মনিকার সঙ্গে তাঁর "অনুপযুক্ত" সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, তাঁর আগের বক্তব্য আইনি দিক থেকে মিথ্যা ছিল না। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর কেনেথ স্টার তাঁর তদন্ত প্রতিবেদন প্রতিনিধি পরিষদে পাঠান, যেখানে শপথ নিয়ে মিথ্যা বলা, বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়। ৪৫৩ পাতার এই রিপোর্টে মনিকার সঙ্গে ক্লিনটনের সম্পর্কের অত্যন্ত বিস্তারিত বিবরণ ছিল। এই রিপোর্টের পর ৫ অক্টোবর প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগীয় কমিটি ২১–১৬ ভোটে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সুপারিশ করে এবং ৮ অক্টোবর হাউস রেজোল্যুশন ৫৮১ পাসের মাধ্যমে তদন্তের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই পুরো সংকটের সময় ফার্স্ট লেডি হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত আলোচিত। শুরুতে ১৯৯৮ সালের ২৭ জানুয়ারি এনবিসি-র এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ‘ব্যাপক ডানপন্থী ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ১৭ আগস্ট ক্লিনটন নিজের ভুল স্বীকার করার পরও হিলারি প্রকাশ্যে স্বামীর পাশে দাঁড়ানো অব্যাহত রাখেন, যদিও ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের দাম্পত্যে এটি বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছিল। অন্যদিকে, মার্কিন জনগণের বড় অংশ ক্লিনটনের ব্যক্তিগত আচরণে অসন্তুষ্ট হলেও তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরানোর বিপক্ষে ছিল। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা যায়, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ক্লিনটনের অভিশংসনের বিরুদ্ধে ছিলেন। এমনকি ডিসেম্বরে এক জরিপে ৬৪ শতাংশ মানুষ জানান যে, সংবাদমাধ্যম এই বিষয়ে অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে।
এই অভিশংসন প্রক্রিয়ার মধ্যেই ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে উল্টো পাঁচটি আসন বাড়িয়ে নেয়, যা রিপাবলিকানদের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। তবে ১৯৯৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রতিনিধি পরিষদ ক্লিনটনের বিরুদ্ধে শপথ নিয়ে মিথ্যা বলা ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অভিযোগে দুটি অভিশংসন অনুচ্ছেদ অনুমোদন করে। এরপর ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে সিনেটে ক্লিনটনের বিচার শুরু হয়। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটে কোনো অভিযোগেই প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বিল ক্লিনটন চূড়ান্তভাবে খালাস পান এবং সফলভাবে নিজের মেয়াদ শেষ করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, পিউ রিসার্চ সেন্টার এবং ইউএস গভর্নমেন্ট পাবলিশিং অফিসের সরকারি নথি থেকে জানা যায়।
উপজেলা পরিষদের প্রতিটি সভা শেষ হওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে সভার কার্যবিবরণী সরকারের কাছে পাঠানোর জন্য…
সিলেটের কৃষিপণ্য সরাসরি বিদেশে রপ্তানির পথ সুগম করতে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে প্রায় ৩৮০ কোটি…
টেক্সাসে বুধবার আয়োজিত এক সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বারবার বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।…
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভবনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাড়ে আট ফুট উচ্চতার একটি নগ্ন ভাস্কর্য স্থাপন…
আগামী ২০২৭ সালের ২৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তন। এই সমাবর্তনে অংশ…
ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়া পরিচালিত ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ৫ শিশুসহ অন্তত ৩২ জন নিহত ও…
This website uses cookies.