Header Premium (728×90)

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রণতরি ও ১০ হাজার মার্কিন সেনা, বাড়ছে ইরান যুদ্ধের শঙ্কা

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত যখন অষ্টম মাসে গড়িয়েছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নিজেদের তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলে আরও কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, মার্কিন জনগণের মধ্যে এই যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন ক্রমশ কমছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত ইরান যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ গত রোববার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। এর এক দিন পর ২ হাজারের বেশি মেরিন সেনা নিয়ে রওনা হয়েছে ইউএস আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট (এমইইউ)। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, এই স্ট্রাইক গ্রুপ ও নৌবাহিনীর অন্যান্য ইউনিটে আরও ৯ থেকে ১০ হাজার মার্কিন সেনা যুক্ত হতে পারেন, যার মধ্যে রণতরি ও অন্যান্য জাহাজে থাকা নাবিক ও মেরিন সেনারাও রয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নভেম্বরের শেষ নাগাদ ইরানের কাছাকাছি মোট তিনটি বিমানবাহী রণতরি ও দুটি উভচর অবতরণকারী দল অবস্থান করবে। এভাবে বিপুল সামরিক শক্তি এক জায়গায় জড়ো করার ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও বেশি বিকল্প থাকবে। ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক তানিয়া নুরি জানিয়েছেন, এই নতুন মোতায়েনে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানও রয়েছে। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি জানান, কূটনৈতিক আলোচনা যে পথেই চলুক না কেন, ট্রাম্পের জন্য সামরিক পদক্ষেপের সুযোগ উন্মুক্ত রাখতেই এই যুদ্ধজাহাজ ও সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। এমনকি ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে সামরিক সরঞ্জাম বা বাহিনী প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে পেন্টাগনের নেই। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ট্রাম্পের নতুন কোনো হামলার নির্দেশ বাস্তবায়নে মার্কিন বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ও অস্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সেনা মোতায়েন হয়েছিল ১৯৫৮ সালের জুলাইয়ে লেবানন সংকটের সময়, যখন বৈরুতে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মেরিন ও সেনা পাঠানো হয়েছিল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়েও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। চলতি বছরের শুরু থেকেই ট্রাম্প এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছেন, যার অংশ হিসেবে শুরুতে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরিসহ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ আরব সাগরে পাঠানো হয়েছিল।

ওপেন সোর্স গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক উড়োজাহাজের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ১২০টির বেশি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর মার্কিন বিমানবাহিনীর সবচেয়ে বড় আকারের মোতায়েন। এর মধ্যে ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবর্ন ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম (অ্যাওয়াকস), এফ-৩৫ স্টিলথ স্ট্রাইক ফাইটার, এফ-২২, এফ-১৫ ও এফ-১৬ যুদ্ধবিমান রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি নিয়মিত সেনা বদল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি। এর আগে গত মার্চে পেন্টাগন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছিল। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল ট্রিপলি অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ (ইউএসএস ট্রিপলি ও ৩১তম এমইইউ), দ্বিতীয়টি ছিল বক্সার অ্যাম্ফিবিয়াস রেডি গ্রুপ (ইউএসএস বক্সার ও ১১তম এমইইউ) এবং তৃতীয়টি ছিল ফোর্ট ব্র্যাগের ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্সের প্রায় ২ হাজার প্যারাশুটিস্ট সেনা। সব মিলিয়ে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যে ইতিমধ্যে প্রায় ৭ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

নতুন এই সেনা মোতায়েন যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে বোমা হামলা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে হামলার নির্দিষ্ট স্থান নিয়ে বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই সেনা মোতায়েন আসলে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ওয়াশিংটনের একটি দর-কষাকষির কৌশল। গত সপ্তাহে ইরান সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যার শর্ত ছিল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চায় আলোচনার টেবিলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টিও আসুক। ট্রাম্প সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে এমন কিছু বিষয় ছিল যা তিনি এক বছর আগেও অনুমোদন করতেন না এবং এখনো করবেন না।

সামরিক চাপের পাশাপাশি তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। এ সপ্তাহে ইরানের রেল ও গাড়ি নির্মাণ খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়, যার লক্ষ্য তেহরানের অবশিষ্ট রাজস্বের উৎস দুর্বল করা। এদিকে পরোক্ষ শান্তি আলোচনা চললেও এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। সেখানে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও পারমাণবিক আলোচনা শুরুর বিনিময়ে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং লেবানন ও ইয়েমেনকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছিল, যা ট্রাম্প নাকচ করে দেন।

জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়ালৎস এনবিসিকে বলেছেন, ইরানের জব্দ অর্থ ছাড় ও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের দাবি মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ এগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, বরং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাতটি প্রস্তাবের অধীন বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুদ্ধ আবার শুরু করতে তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে তারা নিউইয়র্কে যুদ্ধের বয়ান বিক্রি করতে আসেননি, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে টেক্সাসের ডেন্টনে পিটারবিল্ট মোটরসের একটি কারখানায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, বর্তমান সংঘাত খুব শিগগির শেষ হবে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে তেহরানকে গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, ইরান হয়তো সঠিক ও বুদ্ধিমান কোনো পদক্ষেপ নেবে, নয়তো খুব বেশি দিন টিকে থাকবে না।

এই ইউনিট যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত।এ দুটি মেরিন বাহিনী মিলে এ অঞ্চলে আরও ৪ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক যুক্ত করেছে।তৃতীয়টি ছিল নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগে অবস্থানরত ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের ইমিডিয়েট রেসপন্স ফোর্সের প্রায় ২ হাজার সেনার একটি দল।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক: প্রেস কাউন্সিল

গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সচিব…

8 hours ago

ঢাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে একদিনে গ্রেপ্তার ৪৬৫, মামলা ৭৩

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৪৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা…

8 hours ago

কয়রার যোগাযোগ সংকট কাটাতে ৬০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ

খুলনার কয়রা উপজেলার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট নিরসনে প্রায় ৬০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের একটি মাস্টার প্ল্যান…

8 hours ago

দেশে ২ কোটি শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা, লক্ষ্য আরও ৩৫ লাখ

সারা দেশে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে দুই কোটি শিশুকে টিকা দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী…

8 hours ago

সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র…

9 hours ago

ভাঙ্গুড়ায় নৈশ প্রহরী পদে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ

পাবনার ভাঙ্গুড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজের নৈশ প্রহরী পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ১ লাখ ২০…

9 hours ago

This website uses cookies.