Header Premium (728×90)

যুদ্ধ জিতলে লুটের মালে বিজয়ীরই অধিকার, জাতিসংঘে ঘোষণা ট্রাম্পের

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়। এরপর এক নজিরবিহীন চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই সামরিক অভিযান ও তেলচুক্তির মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র টানেন। তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলেন, যুদ্ধে যে বিজয়ী, লুটের মালামাল সে–ই পাবে, এটাই নিয়ম। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলাকে একসঙ্গে ধরলে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল এখন তাদের হাতে।

৮০ বছর আগে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধ ঠেকাতে এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়েই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, প্রয়োজনে তিনি যুদ্ধ করবেন এবং বিজয়ের পুরস্কার হিসেবে পরাজিত দেশের মূল্যবান সম্পদে ভাগ বসাবেন। একই ভাষণে তিনি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। শক্তির উদাহরণ হিসেবে তিনি ইরানকে টেনে এনে প্রশ্ন করেন, তিনি কি ইরানের সঙ্গে চুক্তি করবেন, নাকি ইসলামিক রিপাবলিককে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন? তিনি ইরানকে এমনভাবে ‘নরকে পাঠানোর’ হুমকি দেন যাতে তাদের টিকে থাকার বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো আশা না থাকে।

ট্রাম্পের এই হুমকি নতুন নয়। ২০১৭ সালে সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণেও তিনি উত্তর কোরিয়াকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়েছিলেন। ৯ বছর পর ইরানকে নিশ্চিহ্ন করার হুমকি দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, এটি কোনো তাৎক্ষণিক মুখ ফসকানো কথা নয়, বরং শক্তি প্রয়োগের অধিকার সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের পুনরাবৃত্তি। ২০১৭ সালের ভাষণে তিনি শক্তিশালী, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্মানের কথা বললেও, গতকালের ভাষণে সেই সার্বভৌমত্বের ধারণাই উল্টে দিয়েছেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ, আর দুর্বল দেশের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় স্বার্থের’ অধীন।

জাতিসংঘ সনদ অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকি নিষিদ্ধ করেছে, যার ব্যতিক্রম কেবল নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন অথবা আত্মরক্ষা। ভেনেজুয়েলা বা ইরানের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়া হয়নি, আবার ট্রাম্প একে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবেও উপস্থাপন করেননি। বরং তাঁর যুক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, শত্রুর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আচরণ ও বিজয়ের পর অর্থনৈতিক সুবিধা। ট্রাম্প আরও বলেন, পশ্চিম গোলার্ধ তো বটেই, সারা বিশ্বে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে এবং কোথায়, কখন, কীভাবে সেই শক্তি প্রয়োগ হবে, তার সিদ্ধান্ত নেবে ওয়াশিংটন একাই।

ভাষণের অন্য অংশে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ‘আমেরিকাবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে তা ত্যাগের আহ্বান জানান। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার প্রস্তাবিত বৈশ্বিক কার্বন শুল্কের বিরোধিতা করেন, ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার ভূমিকার সমালোচনা করেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও প্রত্যাখ্যান করেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা বা ‘কমান্ডার ইন চিফ’ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। রয়টার্স-ইপসস জরিপে তাঁর সমর্থন ৩২ শতাংশে নেমে আসায়, এই ভাষণের মাধ্যমে তিনি অনুগত সমর্থকদের কাছে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টা করেছেন। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করার ধারাবাহিকতায় ট্রাম্পের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক নীতি-আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

মঙ্গলে ৫০০০ দিন পার করে নতুন উপত্যকায় নাসার কিউরিওসিটি

মঙ্গলে অবতরণের ১৪ বছর পূর্তি ও ৫০০০ সল অতিক্রমের পর কিউরিওসিটি রোভার এখন ভালে গ্রান্দে…

3 minutes ago

লালমনিরহাট কারাগারে ধারণক্ষমতার তিন গুণ বন্দি, তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি

লালমনিরহাট জেলা কারাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন গুণেরও বেশি বন্দি অবস্থান করছেন। ১৯০ জনের ধারণক্ষমতার এই…

13 minutes ago

ইরানের বিমান চলাচলের ওপর সর্বাত্মক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ইরানের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতের ওপর বুধবার থেকে কার্যকর হয়েছে সর্বাত্মক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। এর ফলে…

15 minutes ago

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী ও হিন্দু পরিবারের মেয়েদের অধিকার

সম্প্রতি পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীটি হিন্দু পরিবারের মেয়েদের সম্পত্তি প্রাপ্তি এবং মা-বাবার শেষ…

17 minutes ago

জাতিসংঘে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের ৩ ঘণ্টার বৈঠক, নতুন আলোচনার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকরা তিন ঘণ্টার বিরল এক বৈঠকে…

20 minutes ago

ডিএসইর ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার জরিমানা মওকুফ চায় প্রাইম ফাইন্যান্স

ডিএসইর ১ কোটি ৪০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা মওকুফের জন্য বিএসইসির দ্বারস্থ হয়েছে আর্থিক…

21 minutes ago

This website uses cookies.