Header Premium (728×90)

বাব আল-মান্দেব হুথিদের দখলে, সৌদির অনুরোধ সত্ত্বেও দূরে থাকছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের মিত্র হুথি গোষ্ঠী ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। লোহিত সাগরের দীর্ঘ উপকূল ও কৌশলগত দ্বীপের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাবেও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে তারা। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে নতুন করে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে গত সপ্তাহান্তে ওমানের মাসকাটে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে গোপন বৈঠকে বসেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে হুথিরা আশ্বাস দিয়েছে যে, লোহিত সাগরে তারা কোনো মার্কিন জাহাজে হামলা চালাবে না। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো জাহাজের ওপর তাদের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। অতীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের হামলা এবং তাদের ইরানঘনিষ্ঠ ও মার্কিনবিরোধী অবস্থানের কারণে এই আশ্বাসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথিদের এই নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া ছাড়া ওয়াশিংটনের সামনে বিকল্প পথ খুব সীমিত।

ইয়েমেনে হুথিদের দমনে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে তিনি ট্রাম্পকে দুবার ফোন করে হামলার অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরপরই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জরুরি সমন্বয়ের জন্য রিয়াদে যান। এই সফর থেকে স্পষ্ট হয় যে, সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন থাকলেও সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয় ওয়াশিংটন।

এদিকে ইসরাইলও সৌদির পক্ষে ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ইসরাইলের সরাসরি এই যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ গাজা, লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিম তীর ও ইরান নিয়ে ইতিমধ্যেই বহুমুখী সামরিক চাপে রয়েছে দেশটি। এই পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে নতুন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করা তাদের জন্য কঠিন হবে।

ইয়েমেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের এই অনাগ্রহের কারণে সৌদি আরবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মূলত এ কারণেই গত কয়েক বছর ধরে রিয়াদ বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সৌদির তেল স্থাপনায় বড় ধরনের হামলার পর থেকে তারা এই বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে সৌদি আরব। পরবর্তীতে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও সম্প্রসারণ করা হয়। ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সাইমন মাবন অবশ্য মনে করেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তা বলয়কে আরও বহুমুখী করার একটি চেষ্টা।

ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি না জড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ইরানের সঙ্গে তাদের চলমান সংঘাত। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা এখনও অনিশ্চিত। ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের কারণে সামরিক ব্যয় ও তেলের দাম অনেক বেড়েছে। পেন্টাগনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম চার মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে কেবল গোলাবারুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ২২ বিলিয়ন ডলার। এই সংঘাতে অসংখ্য মার্কিন যুদ্ধবিমানও ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভাণ্ডারে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যদিও ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে তাদের হাতে এখনও পর্যাপ্ত অস্ত্র রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, কারণ তিনি নিজেই চিরস্থায়ী যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব—উভয় নৌপথই চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সিংহভাগ তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা হয়, আর বাব আল-মান্দাব এশিয়া ও চীনের বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বাব আল-মান্দাব দীর্ঘকাল বন্ধ থাকলে চীনের ওপর চাপ বেশি পড়বে। তবে এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে যুক্তরাষ্ট্রও মুক্ত থাকবে না। সৌদির অবকাঠামো ও জাহাজে হামলা হলে মার্কিন মিত্ররা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পরিবহন ও জ্বালানি খরচ বাড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদেরই মাশুল দিতে হবে।

অধ্যাপক মাবনের মতে, হুথিদের বাব আল-মান্দাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেওয়া চীনকে দুর্বল করার কোনো কৌশল নয়। মূলত ইরান যুদ্ধেই চরম চাপে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এখন ইয়েমেনে আরেকটি নতুন যুদ্ধের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে চাইছে।

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৩৫আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৪২

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

ওমান উপকূলে মিসাইল হামলার কবলে বাংলাদেশি নাবিকদের জাহাজ

ওমান উপকূলে এমভি কেপ দাও নামের একটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজে মিসাইল হামলার শিকার হয়েছে। হামলায়…

7 minutes ago

ইবির সাদ্দাম হলের একই কক্ষের তিন বন্ধু হলেন সিভিল জজ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের তিন বন্ধু বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিভিল…

28 minutes ago

যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না ইরান: পেজেশকিয়ান

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের চাপের…

40 minutes ago

নিউইয়র্কে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

নিউইয়র্কে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যান সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকে জনস্বাস্থ্য ও…

51 minutes ago

মাদারগঞ্জে অনিয়মের দায়ে দুই ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা

জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ী বাজারে অনিয়মের অভিযোগে দুই ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ…

5 hours ago

নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক এমপি মোশতাক আহমেদ রুহী গ্রেপ্তার

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের একটি বাসা থেকে নেত্রকোনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোশতাক আহমেদ রুহীকে…

6 hours ago

This website uses cookies.