Header Premium (728×90)

মাও সে-তুংয়ের বিপ্লব যেভাবে চীনকে বদলে দিয়ে পথ হারিয়েছিল

১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মাও সে-তুংয়ের প্রয়াণের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটেছিল চীনের ইতিহাসের এক সুদীর্ঘ ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের। প্রায় তিন দশক ধরে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিপ্লবী রাষ্ট্র একদিকে যেমন এক বিশাল দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, অন্যদিকে তা ডেকে এনেছিল চরম দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়। মাও সে-তুং কি আধুনিক চীনের প্রকৃত রূপকার, নাকি নিজের রাজনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্রকে বিপর্যস্ত করা এক বিপ্লবের নায়ক? মার্কিন রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু জি ওয়াল্ডারের ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘চায়না আন্ডার মাও: আ রেভোল্যুশন ডিরেইলড’ গ্রন্থে এই জটিল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ৪০০ পৃষ্ঠার বেশি দীর্ঘ এই বইয়ে ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা গ্রহণ থেকে শুরু করে ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের গভীর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ রয়েছে। ওয়াল্ডারের মূল দাবি হলো, যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মাওয়ের প্রাথমিক সাফল্যের ভিত্তি গড়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোই তাঁর চরম ব্যর্থতার পথ তৈরি করে দেয়।

দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসে। মাওয়ের নেতৃত্বে চীন এক নতুন রাজনৈতিক কাটামোর অধীনে প্রবেশ করে, যাকে সমাজবিজ্ঞানী ওয়াল্ডার বিপ্লবের সমাপ্তি নয় বরং দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখিয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দারিদ্র্য ও কৃষিনির্ভর সমাজকে পুনর্গঠনে মাওয়ের অধীনে ভূমি সংস্কার, শিল্পের জাতীয়করণ এবং পরিকল্পিত অর্থনীতি চালু হয়। এই সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের আদলে গড়ে তোলা সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পিত অর্থনীতি। এই ব্যবস্থার ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হলেও ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চীনে যখন দ্রুত শিল্পায়ন ও গ্রামীণ রূপান্তর ঘটছিল, তখন মাও মনে করেন যে সোভিয়েত মডেলের আমলাতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র চীনের জন্য যথেষ্ট নয়। স্টালিন-পরবর্তী সোভিয়েত নেতৃত্বের সঙ্গে আদর্শগত বিরোধের (সিনো-সোভিয়েত বিরোধ) জেরে মাও চীনের জন্য নিজস্ব ও উগ্র সমাজতান্ত্রিক পথ খুঁজতে শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ‘শত ফুল ফুটুক’ নীতির মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী ও সমাজকে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের আহ্বান জানান। তবে সমালোচনা তীব্র রূপ নিলে শুরু হয় কঠোর ডানপন্থাবিরোধী অভিযান। এরপরই মাও গ্রহণ করেন তাঁর অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক কর্মসূচি ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’।

১৯৫৮ সালে শুরু হওয়া ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’-এর লক্ষ্য ছিল কৃষিনির্ভর চীনকে দ্রুত শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তর করা। কৃষিতে বিশাল জনগোষ্ঠীভিত্তিক ‘কমিউন’ গড়ে তোলা হয় এবং অবাস্তব উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। স্থানীয় কর্মকর্তারা রাজনৈতিক আনুগত্য প্রমাণে উৎপাদনের অতিরঞ্জিত হিসাব পাঠাতে শুরু করেন এবং সেই অনুযায়ী রাষ্ট্র জোরপূর্বক খাদ্য সংগ্রহ করে। অথচ ‘হুকৌ’ বা কঠোর গৃহস্থালি নিবন্ধন ব্যবস্থার কারণে গ্রামীণ মানুষ জমিতেই আটকে ছিলেন এবং শহরের শ্রমিকদের খাবার জোগাতে গিয়ে গ্রামে তীব্র খাদ্যঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চীনে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যা মাওয়ের শাসনের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর মাও কিছুটা পেছনে সরে যান এবং লিউ শাওছি ও দেং শিয়াওপিংসহ অন্যান্য নেতারা বাস্তবসম্মত উপায়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। তবে মাও রাজনীতি থেকে পুরোপুরি সরেননি। তিনি মনে করতে থাকেন যে, বিপ্লবের আদর্শ হারিয়ে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী শক্তিশালী হচ্ছে এবং সমাজতন্ত্রের ভেতর থেকেই ‘পুঁজিবাদী পুনঃস্থাপন’ ঘটছে। এই আশঙ্কা থেকেই ১৯৬৬ সালে তিনি শুরু করেন ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। তাঁর আহ্বানে তরুণ ও শিক্ষার্থীরা ‘রেড গার্ড’ বা লাল রক্ষীবাহিনীতে সংগঠিত হয়ে তথাকথিত পুঁজিবাদী ও বিপ্লববিরোধীদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

খুব দ্রুত এই আন্দোলন দেশের প্রচলিত কাঠামোকে ধ্বংস করে দেয়। বন্ধ হয়ে যায় স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও দলীয় নেতারা প্রকাশ্য অপমান, নির্যাতন, কারাদণ্ড ও হত্যার শিকার হন। ওয়াল্ডারের মতে, এটি কেবল নিচ থেকে উঠে আসা গণ-আন্দোলন ছিল না, বরং মাও ও তাঁর সহযোগীরা রেড গার্ডদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। ওয়াল্ডারের গবেষণা অনুযায়ী, সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সহিংসতায় প্রায় ১১ থেকে ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যার বড় অংশই ঘটে ১৯৬৮ সালে ‘শ্রেণিশত্রু’ দমনের নামে সামরিক অভিযানে।

১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চীন কার্যত সেনাপ্রধান ও মাওয়ের মনোনীত উত্তরসূরি লিন বিয়াওয়ের অধীনে একধরনের সামরিক শাসনে চলে যায়। পরবর্তীতে লিন বিয়াওয়ের পতন ও সন্দেহজনক মৃত্যু মাওয়ের নৈতিক ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দেয়। মাওয়ের শাসনামলের আরেকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তীব্র ব্যক্তিপূজা। তাঁর ছবি, বাণী ও ‘লিটল রেড বুক’ রাজনৈতিক আনুগত্যের চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওয়াল্ডারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেতা, দলীয় কাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্কই মাও-যুগের সাফল্য ও ব্যর্থতাকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

ঢাকায় গ্রেপ্তার ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা আ.লীগ নেতা ফরিদ উদ্দিন

ঢাকার কাফরুলে অভিযান চালিয়ে ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদ উদ্দিন তালুকদারকে গ্রেপ্তার…

7 minutes ago

ঢাকার আদালত থেকে ফের কৌশলে পালালেন খুনের আসামি শরিফুল

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজিরা দিতে এসে কৌশলে হাতকড়া খুলে পালিয়ে গেছেন খিলগাঁও থানার হত্যা…

20 minutes ago

রাজশাহীতে উদ্ধার হওয়া রেবন্তর বিরল মূর্তিসহ ২৬ প্রত্নসম্পদ জাদুঘরে

রাজশাহীর সীমান্ত ও চরাঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া সূর্যপুত্র রেবন্তর একটি অত্যন্ত বিরল মূর্তিসহ ২৬টি প্রত্ননিদর্শন…

32 minutes ago

ইউক্রেনের ওলেশকিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র অভাব

রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। মাইন ও…

35 minutes ago

নড়াইলে মাদক নিয়ে বিরোধে পাঁচ মামলার আসামি কুপিয়ে হত্যা

নড়াইলের নড়াগাতী থানার জয়নগর ইউনিয়নের দেবদুন গ্রামে মাদক বেচাকেনার দ্বন্দ্বে আরাফাত মোল্যা নামে এক ব্যক্তিকে…

43 minutes ago

শিশুদের শৈশব নিরাপদ ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের

শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে ডা. জুবাইদা রহমান শিশুদের নিরাপদ শৈশব…

45 minutes ago

This website uses cookies.