Header Premium (728×90)

হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বে কঠিন ফাঁদে দক্ষিণ কোরিয়া

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক লড়াইয়ে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্ত হলে তার ‘মারাত্মক পরিণতি’ হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সিউল সামরিক সহায়তা পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে—এমন খবর প্রকাশের পর এই কড়া বার্তা দিল ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গত ৭ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো দেশের সামরিক উপস্থিতি বা অভিযানে অংশ নেওয়াকে সরাসরি আগ্রাসনকারীর প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখবে ইরান। তিনি আরও বলেন, কোনো সার্বভৌম ও দায়িত্বশীল দেশেরই যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও হুমকির মুখে নতি স্বীকার করা উচিত নয় এবং ইরানি জাতির বিরুদ্ধে চালানো অপরাধের সহযোগী হওয়া কাম্য নয়। তবে তেহরান দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে তাদের ৬৪ বছরের বেশি সময়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে মূল্যায়ন করে এবং ওয়াশিংটনের সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে এই দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত না করার আহ্বান জানায়।

ইরানের এই হুঁশিয়ারির বিপরীতে দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ৭ সেপ্টেম্বর দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে অংশ নেওয়ার বিভিন্ন পথ খুঁজছে সিউল। এর অংশ হিসেবে নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ব্যাহত না করে সমুদ্র টহল বিমান, রসদ সরবরাহকারী নৌযান এবং মাইন শনাক্ত ও অপসারণের সরঞ্জাম পাঠানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ইয়োনহাপ বার্তা সংস্থার খবর অনুযায়ী, এ বিষয়ে ওয়াশিংটন সিউলের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে চলেছে, তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ওয়াশিংটনের চাপ সৃষ্টির বিষয়টি বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত আগস্টে দাবি করেন, তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার উদারপন্থী প্রেসিডেন্ট লি জে মিউংকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ‘একটু সাহায্য’ করতে বলেছিলেন, কিন্তু সিউল তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপরই দুই দেশের সামরিক সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার হামলা মোকাবিলায় প্রতিবছর আয়োজিত যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ (ইউএফএস) শুরুর আগের দিন সন্ধ্যায় তা কমিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। ফলে ১১ দিনের মহড়াটি পাঁচ দিনে নেমে আসে। ট্রাম্প তাঁর প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একে ব্যয়বহুল ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের প্রতি শত্রুতাপূর্ণ বলে আখ্যা দেন। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন পার্লামেন্টে জানান, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আগে থেকে কিছু জানায়নি। এমনকি সেপ্টেম্বর মাসে নির্ধারিত আরেকটি সামরিক মহড়াও বাতিল করেছে ওয়াশিংটন, যার কারণ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সামরিক সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করা হয়েছে।

কোরিয়া যুদ্ধের পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক অগ্রগতিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে এক দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় কোরিয়া উপদ্বীপে প্রায় ২৯ হাজার মার্কিন সেনা স্থায়ীভাবে মোতায়েন রয়েছে এবং পরমাণু শক্তিধর উত্তর কোরিয়াকে ঠেকাতে সিউল ওয়াশিংটনের সুরক্ষার ওপর নির্ভর করে। এর প্রতিদান হিসেবে অতীতে ইরাক যুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি মার্কিন অভিযানে সমর্থন দিয়েছিল সিউল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে কিছু টানাপোড়েন দেখা গেছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ওয়াশিংটন ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে সিউল সমঝোতার পথ বেছে নেয়, যার ফলে শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এ ছাড়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে জর্জিয়ায় হুন্দাইয়ের একটি কারখানায় মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক বিভাগের (আইসিই) অভিযানে শত শত দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক গ্রেপ্তার হলে দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অবশ্য দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে গত বছরের অক্টোবরে ট্রাম্প সিউল সফর করেন এবং চলতি বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট লিও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন।

বর্তমানে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। নিজেদের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আমদানি করতে হয় দেশটিকে। চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত থাকায় দেশটিতে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে এবং কোরিয়ান মুদ্রা ‘ওন’-এর মান গত ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখার পেছনে সিউলের বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। তবে বিদেশে সেনা বা সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবিধান ও আইন অনুযায়ী পার্লামেন্টের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূল। এদিকে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির কিছু সদস্য এবং বিরোধী দলগুলো এই সামরিক পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছে। সাধারণ দক্ষিণ কোরীয়রাও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন। সব মিলিয়ে একদিকে ওয়াশিংটনের চাপ, অন্যদিকে তেহরানের হুমকি এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে এক কঠিন ফাঁদে পড়েছে সিউল।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

Recent Posts

ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’র পরিচালনা পর্ষদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ব্যাংকের সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম…

8 minutes ago

হামের উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১২৭০ জন

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন…

20 minutes ago

ঢাকা ও উপকণ্ঠের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আধুনিকায়নে এডিবির ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ

রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ আধুনিকায়ন করতে ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ অনুমোদন…

21 minutes ago

গাজীপুরে ট্রাক ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩

গাজীপুর মহানগরের ধীরাশ্রম এলাকায় ট্রাক ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুরুতর…

38 minutes ago

জাতিসংঘে এরদোয়ানের ভাষণের সময় মোবাইল ফোনে মগ্ন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের ভাষণের সময় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার…

45 minutes ago

মাগুরায় বেশি দামে সার ও মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ বিক্রি, ১ লাখ টাকা জরিমানা

মাগুরার শ্রীপুরে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ ও কীটনাশক…

49 minutes ago

This website uses cookies.