Header Premium (728×90)

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে কৌশলগত সংকটে ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে এক জটিল ও সংকটময় মোড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সমীকরণ কী হবে, তার সঠিক দিশা পেতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প ও তার প্রশাসন। সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ওয়াশিংটনের সামনে সামরিক ও কূটনৈতিক সমাধানের পথগুলো ততই সংকুচিত হয়ে আসছে। সিএনএনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্টিফেন কলিনসন তার এক বিশেষ বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে বহুগুণ ঝুঁকি ও খেসারত দিতে হতে পারে। টানা ১৩ রাতের বিধ্বংসী বিমান হামলার পর ওয়াশিংটন সাময়িকভাবে সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছে। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, এই স্থগিতাদেশ মূলত কূটনৈতিক আলোচনার জন্য একটি নতুন জায়গা তৈরির চেষ্টা। তবে এর পাশাপাশি প্রশাসন এটাও স্পষ্ট করেছে যে, যেকোনো মুহূর্তে হামলা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাদের বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত।

কূটনৈতিক পথটি বাস্তবে অত্যন্ত জটিল। ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরান আলোচনার কিছু ইঙ্গিত দিলেও তাদের মূল দাবিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে নিজেদের অধিকার বজায় রাখার সিদ্ধান্ত থেকে ইরান পিছু হটতে সম্পূর্ণ নারাজ। যুদ্ধের প্রায় পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ট্রাম্প নিজেকে এক পরিচিত ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন। তীব্র হামলা চালিয়ে ইরানকে নতিস্বীকার করানোর কৌশল পূর্বে যেমন কার্যকর হয়নি, এখনও তেমনি ফল দিচ্ছে না।

ট্রাম্পের সামনে থাকা বিকল্পগুলোর মধ্যে প্রথমত, আকাশপথে হামলার তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। এর মাধ্যমে ইরানের তেল অবকাঠামো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পরিবহন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালানো হতে পারে। এতে ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে গেলেও দেশটির কোটি কোটি সাধারণ নাগরিকের ওপর তীব্র মানবিক বিপর্যয় নেমে আসবে। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে সাহায্য করার যে কথা বলেছিলেন, এই পদক্ষেপ তার সম্পূর্ণ বিপরীত হবে। এমনকি সিআইএ এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে দেখা গেছে, এ ধরনের টানা বোমাবর্ষণেও তেহরানের কট্টরপন্থি শাসকদের অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না।

দ্বিতীয়ত, পূর্ণাঙ্গ সমুদ্র অবরোধ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ। এর মাধ্যমে ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ বসিয়ে দেশটির সরকারের অর্থপ্রবাহ এবং ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ডস করপসের (আইআরজিসি) সামরিক রাজস্ব সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব। তবে এই কৌশল সফল হতে কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর লেগে যেতে পারে, যা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ধৈর্য বা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অধিকন্তু, এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা জোরদার করবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে।

তৃতীয়ত, স্থলভাগে সেনা মোতায়েন করা। মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তিগত ও শক্তিমত্তার সুবাদে যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ হলো হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো, যেখানে বিপুল প্রাণহানি এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি থাকবে। মার্কিন জনগণ এমনিতেই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে, ফলে এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

চতুর্থত, চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করা। ইতিপূর্বে ভেঙে যাওয়া প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পুনর্বহাল করা। কিন্তু তেহরান তখনই এতে রাজি হবে, যখন তাদের হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব আইন প্রয়োগ ও শুল্ক আদায়ের দাবি মেনে নেওয়া হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে, কারণ যুদ্ধের আগে এই আন্তর্জাতিক জলপথটি পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল। এমন ছাড় দিলে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির হার্ডলাইনার এবং রিপাবলিকান দলের ভেতরেই ট্রাম্প তীব্র সমালোচনার মুখে পড়বেন।

ওয়াশিংটনের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত সপ্তাহে তেলের দাম বৃদ্ধিতে মার্কিনীদের দৈনন্দিন পেট্রোলের খরচ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের মজুতও আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। তার ওপর লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা নতুন করে তেল সরবরাহ রুটগুলোতে হুমকি দিচ্ছে। সৌদি তেলের ট্যাংকারে হামলার ফলে বাব আল মান্দেব প্রণালিতে জাহাজের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে আসন্ন নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান দল কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং যৌথ চিফ অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সংঘাত আরও বাড়ানোর মারাত্মক পরিণতি নিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন। জেনারেল কেইন সামরিক বাহিনীর দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর যুদ্ধাস্ত্রের ফুরিয়ে আসার বিষয়েও হোয়াইট হাউসকে অবহিত করেছেন।

সর্বশেষ জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭৬ শতাংশ সাধারণ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও জটিল। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ দাবি করেছেন যে ইরান এখন অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী অবস্থানে থেকে আলোচনা করছে। তবে যুদ্ধের বাস্তবতা হচ্ছে, যতক্ষণ ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং সমুদ্রপথে আঘাত হানা বজায় রাখতে পারছে, ততক্ষণ তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিরবচ্ছিন্ন চাপের মুখে রাখতে সক্ষম। পাঁচ মাসের সংঘাত শেষেও ট্রাম্পকে বিজয়ী হিসেবে বের করে আনতে পারে, এমন কোনো স্পষ্ট বা সহজ কৌশলগত সমাধান আপাতত মার্কিন প্রশাসনের হাতে নেই।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

টি-টোয়েন্টি র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষে পাকিস্তানের আবরার, পেছনে ফেললেন রশিদকে

পাকিস্তানের লেগ স্পিনার আবরার আহমেদ প্রথমবারের মতো আইসিসি টি-টোয়েন্টি বোলারদের র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষে উঠেছেন। তিনি আফগানিস্তানের…

17 minutes ago

টানা সাত দিন কমল বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে টানা সাত দিন ধরে জ্বালানি তেলের দাম কমছে। ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই ক্রুডের…

23 minutes ago

মহানবী (সা.)-এর ইনসাফ: মানবজাতির জন্য অনুপম আদর্শ

মানবজাতির জন্য ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার এক অনুপম আদর্শ হিসেবে মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবনকে তুলে…

27 minutes ago

মুকসুদপুরে পৃথক স্থান থেকে নারীসহ দুইজনের মরদেহ উদ্ধার

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলায় পৃথক স্থান থেকে এক নারীসহ দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার সন্ধ্যায়…

55 minutes ago

ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত ৫ গুণ বাড়ালো ইসি

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদের প্রার্থীদের জামানত পাঁচ গুণ বাড়িয়ে চূড়ান্ত গেজেট…

2 hours ago

মেসির বিদায়ী ম্যাচের টিকিট বিক্রির নতুন সময়সূচি ঘোষণা

লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচের টিকিট বিক্রির সময়সূচি দুই দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন সময় অনুযায়ী…

2 hours ago

This website uses cookies.