দেশের প্রধান বিমানবন্দর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এয়ারসাইড এলাকায় চলাচলকারী যানবাহনের ডিজিটাল নজরদারিতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে ও এপ্রোনের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় প্রতিদিন শত শত গাড়ি চলাচল করলেও সেগুলোতে এখনো ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) চালু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে এসব যানবাহনের অবস্থান ও গতিবিধি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না, যা রানওয়েতে অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ, উড়োজাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং ফ্লাইট পরিচালনায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইসিএও) নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বারবার তাগাদা সত্ত্বেও অনেক এয়ারলাইন্স, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান তাদের গাড়িতে ভিটিএস স্থাপন করেনি। অথচ সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে বাস্তবায়িত রাডার ও সিএনএস-এটিএম প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরে আধুনিক সারফেস মুভমেন্ট গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম এবং ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়ায় বিমানবন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে।
নির্ধারিত সময়ে নির্দেশনা না মানলে এয়ারসাইড প্রবেশপাস বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে বেবিচক সর্বশেষ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে অক্টোবরের মধ্যে ভিটিএস বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হলেও ৮ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো বেবিচকের কাছে তাদের যানবাহনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিমানবন্ধরের এয়ারসাইড হলো সেই সংরক্ষিত এলাকা, যেখানে উড়োজাহাজ ওঠানামা ও ট্যাক্সিওয়ে দিয়ে চলাচল করে এবং এপ্রোনে পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার কার্যক্রম চলে। এই স্পর্শকাতর এলাকায় ব্যাগেজ ট্রলি, পুশব্যাক ট্রাক্টর, জ্বালানিবাহী ট্যাঙ্কার, ক্যাটারিং ভ্যান, কার্গো লোডার, পানি সরবরাহকারী গাড়ি, যাত্রীবাহী বাস, রক্ষণাবেক্ষণ ভ্যান, অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তা টহল গাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের যান চলাচল করে। একটি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন এই এলাকায় ৭০০ থেকে ৮০০টি সার্ভিস ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং যানবাহন চলে। তবে অন্য একটি সূত্রের মতে, প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ থেকে ৪৫০টি গাড়ি এয়ারসাইডে প্রবেশ করে, যা ব্যস্ত সময়ে প্রায় ৫০০-তে পৌঁছায়। যানবাহনের সঠিক সংখ্যা নিয়ে দ্বিমত থাকলেও বিপুলসংখ্যক গাড়ির গতিবিধি পর্যবেক্ষণে যে বড় ঘাটতি রয়েছে, তা স্পষ্ট।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব যানবাহনের একটি বড় অংশ এখনো ট্র্যাকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকায় কোনো গাড়ি কোথায় আছে, কত গতিতে চলছে বা নির্ধারিত পথ মানছে ki না, তা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে না। ফলে গ্রাউন্ড কন্ট্রোলারদের ম্যানুয়াল নজরদারি ও রেডিও যোগাযোগের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা মানবিক ভুলের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাতে বা ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা কমে গেলে এই ঝুঁকি আরও মারাত্মক রূপ নেয়। এপ্রোনে যানজটের কারণে উড়োজাহাজের সেবা পেতে দেরি হওয়া এবং ব্যাগেজ ও ক্যাটারিং গাড়ির সমন্বয়হীনতায় ফ্লাইটের শিডিউল বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কাও থাকে। এমনকি ভারী যানবাহন ভুল পথে গেলে উড়োজাহাজের ডানা বা ইঞ্জিনের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আক্তার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কোনো আপস করা হবে না। ভিটিএস স্থাপন কেবল প্রশাসনিক কোনো নির্দেশনা নয়, এটি আন্তর্জাতিক আকাশপথের নিরাপত্তার অংশ। যেসব সংস্থা বা এয়ারলাইন্স নির্ধারিত সময়ে এই নির্দেশ মানবে না, তাদের যানবাহনের এয়ারসাইড এন্ট্রি পাস পুরোপুরি বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মন্ত্রণালয় থেকে পুরো বিষয়টি সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে।
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলম জানান, বিশ্বের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ভিটিএস ব্যবহার করা হচ্ছে। শাহজালালে এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হলে সব অনুমোদিত যানবাহন কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে গতিবিধি কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা না গেলেও ট্র্যাকার স্থাপন করা হলে প্রতিটি গাড়ির অবস্থান শনাক্ত করা যাবে এবং কোনো গাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা দেওয়া যাবে। এতে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
বিমানবন্ধরের পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এয়ারসাইডে প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করে, যা ভিটিএস ছাড়া পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বারবার তাগাদা দেওয়া হয়েছে এবং এখন আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই।
তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র শাহনুর আহমেদ দাবি করেছেন, তাদের যানবাহনে অনেক আগেই ট্র্যাকার স্থাপন করা হয়েছে। এপ্রোনে চলাচলকারী গাড়ির পাশাপাশি শহরে চলাচলকারী অনেক গাড়িতেও এই ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দ্রুত এই প্রযুক্তি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
এয়ারসাইডে কর্মরত চালকেরাও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে সৃষ্ট নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। পুশব্যাক ট্রাক্টর চালক মো. জাহিদ হোসেন জানান, তিনি প্রতিদিন আট থেকে দশটি ফ্লাইটের উড়োজাহাজ পুশব্যাক করেন। ভিটিএস না থাকায় ম্যানুয়াল নির্দেশনা বুঝতে মাঝে মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং একবার তিনি প্রায় ভুল পথে চলে গিয়েছিলেন। ব্যাগেজ ট্রলি চালক আবদুল মালেক বলেন, ব্যস্ত সময়ে এপ্রোনে একসঙ্গে ২০ থেকে ২৫টি ট্রলি চলে। ট্র্যাকিং ব্যবস্থা না থাকায় রাতে কোন ট্রলি কোথায় আছে তা বোঝা কঠিন হয় এবং গত মাসে দুটি ট্রলির মধ্যে হালকা ধাক্কা লাগার ঘটনাও ঘটেছে।
জ্বালানিবাহী ট্যাঙ্কার চালক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, জ্বালানি নিয়ে চলাচলের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। ভিটিএস থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সতর্কবার্তা পাওয়া যেত, কিন্তু এখন তাদের রেডিও নির্দেশনার ওপরই নির্ভর করতে হয়। ক্যাটারিং ভ্যান চালক নূর মোহাম্মদ জানান, প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি ফ্লাইটে খাবার সরবরাহ করার সময় এপ্রোনে যানজটের কারণে দেরি হয়। ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু থাকলে যাতায়াতের রুট নির্ধারণ ও সমন্বয় সহজ হতো। অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণ ভ্যান চালক রফিকুল হাসান বলেন, উড়োজাহাজ মেরামতের জন্য দ্রুত পৌঁছাতে হলেও অনেক সময় অন্য যানবাহনের কারণে পথ আটকে যায়, যা কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকলে এড়ানো যেত।
অতীতেও শাহজালাল বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড অপারেশন ঘিরে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে একটি পুশকার্টের ধাক্কায় এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজের নোজ হুইল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছিল। ২০২২ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হ্যাঙ্গারে দুটি উড়োজাহাজের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একই বছর ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ট্রলি বিমানের একটি উড়োজাহাজে আঘাত করে। এসব ঘটনা এয়ারসাইডে যানবাহন চলাচল ও গ্রাউন্ড অপারেশনে বিদ্যমান বড় ঝুঁকিগুলোকেই সামনে এনেছে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ভিটিএস ছাড়া এয়ারসাইড পরিচালনা আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করলে কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং ছাড়া কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন। তাই দ্রুত এই ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু করা জরুরি।
বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৩০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে। যাত্রীসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাউন্ড সাপোর্ট যানবাহনের সংখ্যাও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় ভিটিএসের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বেবিচক ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নজরদারি অব্যাহত রাখার কথা বলা হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি এখনো কাটেনি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত ট্র্যাকার স্থাপন, যানবাহনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা জমা এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
নব্বইয়ের দশকে এক অপ্রীতিকর ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর তরুণ শাহরুখ খানকে জামিন পেতে সহায়তা করেছিলেন প্রবীণ…
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত বিক্ষোভে সমর্থন জানাতে গিয়ে মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দান থেকে আটক…
সিরাজগঞ্জের যমুনা তীরবর্তী চায়না বাঁধে বিকেল হলেই বাড়ছে নানা বয়সী মানুষের ভিড়। স্কুল ফাঁকি দিয়ে…
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের জানিয়েছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার মাঝেমধ্যেই কথা…
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বই পড়ে মেধা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতায় আট শিক্ষার্থী ল্যাপটপ জিতেছেন। শনিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের…
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় ওমরাহ পালন করেছেন ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী কেয়া পায়েল। ধর্মীয় এই…
This website uses cookies.