ভারতীয় চলচ্চিত্রের শক্তিমান ও দাপুটে অভিনেতা নানা পাটেকর আর নেই। গত ৮ অক্টোবর ভোরে গোয়ার ডোনা পাউলায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। পুনের উপকণ্ঠে দোঞ্জে এলাকায় নিজের খামারবাড়িতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় এই গুণী অভিনেতার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর প্রয়াণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অভিনেতা অক্ষয় কুমারসহ বিনোদনজগতের অনেকে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
২০২৩ সালে মুম্বাইয়ের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে নিজের জীবনদর্শন নিয়ে নানা পাটেকর বলেছিলেন, ‘একটা কথা মাথায় রাখবেন, আপনি মারা গেলে কেউ মনে রাখবে না। তাই যত দিন বেঁচে আছেন, আনন্দে থাকুন। অন্যের জন্য যদি কিছু করতে পারেন, করুন। কাল মানুষ আপনাকে মনে রাখবে, এই ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে থাকবেন না।’ সেদিন কথাগুলো বলে আলতো হেসেছিলেন তিনি। আজ তাঁর মৃত্যুর পর সেই কথাগুলোই ভক্তদের মনে অন্যভাবে দোলা দিচ্ছে। যিনি ভাবতেন মৃত্যুর পর কেউ মনে রাখে না, আজ তাঁকেই পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন অগুনতি মানুষ।
মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জঞ্জিরায় ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া নানা পাটেকরের শৈশব কেটেছে চরম অভাবের মধ্য দিয়ে। সংসারের হাল ধরতে কৈশোরে সিনেমার পোস্টার এঁকে টাকা উপার্জন করতেন তিনি। পরে মুম্বাইয়ের স্যার জে জে ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লায়েড আর্টসে পড়াশোনা করেন। ছাত্রাবস্থায় নাটকের প্রতি গভীর টান তৈরি হয় তাঁর। মঞ্চে অভিনয়ের হাত ধরেই একসময় চলচ্চিত্রে পা রাখেন। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। আশির দশকে ‘অঙ্কুশ’, ‘প্রতিঘাত’, ‘মোহরে’ ও ‘সালাম বম্বে!’ ছবিতে ছোট ও পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে নিজের প্রতিভার জানান দেন তিনি।
নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ছিল বিধু বিনোদ চোপড়া পরিচালিত ‘পরিন্দা’ সিনেমাটি। এতে খলচরিত্রে অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি ‘প্রহার’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ ও ‘ওয়াজুদ’-এর মতো চলচ্চিত্রে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করেন। বিশেষ করে ১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ ছবিতে তাঁর প্রতিবাদী চরিত্র ও সংলাপ বলার নিজস্ব ভঙ্গি দারুণ সাড়া ফেলে, যার জন্য তিনি সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। পরবর্তীতে ‘অব তক ছাপ্পান’, ‘ অপহরণ’ ও ‘রাজনীতি’ ছবিতেও তিনি প্রশংসিত হন। আবার ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অভিনয় করে নিজের বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দেন। হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি মারাঠি চলচ্চিত্র ও মঞ্চেও তাঁর সমান দাপট ছিল। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মাননায় ভূষিত করে।
অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালকের আসনেও বসেছিলেন নানা পাটেকর। ১৯৯১ সালে তাঁর পরিচালিত ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ মুক্তি পায়। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বিশাল ভরদ্বাজের ‘রোমিও’ এবং প্রকাশ ঝা পরিচালিত ওটিটি সিরিজ ‘সংকল্প’-এ অভিনয় করেছিলেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে পরিচালকের ওপর অগাধ আস্থা রাখতেন এই অভিনেতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন অভিনেতা যদি নিজেকে পরিচালকের কাছে সমর্পণ করে দেন, তবে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতাই ছিল তাঁর অভিনয়ের মূল শক্তি।
ক্যামেরার পেছনের সাধারণ জীবনযাপনই বেশি পছন্দ করতেন নানা পাটেকর। মুম্বাইয়ের কোলাহল ছেড়ে পুনের গ্রামের খামারবাড়িতে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন তিনি। ২০২৪ সালে মুম্বাইয়ের এক অনুষ্ঠানে নিজের নিভৃত জীবন নিয়ে মজা করে বলেছিলেন, ‘আমি তো সব সময় কোয়ারেন্টিনেই থাকি। ১৪ একর জমির ওপর আমার খামারবাড়ি। সেখানে কুকুর, গরু আর ষাঁড় নিয়ে আমার সংসার। বাইরের কেউ আমার এখানে আসে না।’ সিনেমার প্রচার বা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা যেত সাধারণ সুতির পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে অংশ নিতে। অর্থের পেছনে ছোটা পছন্দ করতেন না জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি উপার্জন করে কোনো লাভ নেই, কারণ মৃত্যুর পর কিছুই সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায় না।
অভিনয়ের বাইরে সমাজসেবায় অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন এই অভিনেতা। মহারাষ্ট্রের খরাপীড়িত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। এই সংগঠনের মাধ্যমে বহু অসহায় কৃষক পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও পানিসংরক্ষণের কাজে সাহায্য করা হয়েছে। তবে নিজের এসব ভালো কাজ নিয়ে প্রচার করা একদম পছন্দ করতেন না তিনি। ২০২৩ সালের সাক্ষাৎকারে সমাজসেবার প্রসঙ্গ আসতেই কিছুটা আপত্তি জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যা করি, তা নিজের খুশির জন্য করি। শুধু আমি নই, আমার মতো অনেকে এ রকম কাজ করছেন।’
অভিনয় ও সমাজসেবার পাশাপাশি চমৎকার রান্নাও করতে পারতেন নানা পাটেকর। বলিউডে তাঁর হাতের রান্নার বেশ সুখ্যাতি ছিল। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রয়াত অভিনেতা ঋষি কাপুর একবার তাঁকে রেস্তোরাঁ খোলার পরামর্শও দিয়েছিলেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা সাফল্যের পাশাপাশি নানা বিতর্কও এসেছে তাঁর জীবনে। তবে এই পথচলা নিয়ে কোনো আক্ষেপ ছিল না তাঁর। প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন, জীবনের এই দীর্ঘ সফরে তিনি কোনো ক্ষতির হিসাব করেন না; মানুষের ভালোবাসা ও কাজের আনন্দই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। নিজের ব্যক্তিগত অভিধানে ‘দুঃখ’ শব্দটির কোনো স্থান দেননি তিনি। মৃত্যুর পর কেউ মনে রাখবে না বললেও, ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’ কিংবা ‘ওয়েলকাম’-এর মতো চলচ্চিত্র এবং তাঁর মানবিক কাজগুলোর মাধ্যমে নানা পাটেকর চিরকাল বেঁচে থাকবেন দর্শকদের হৃদয়ে।
আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম টেস্টের প্রথম সেশনটি দারুণভাবে নিজেদের করে…
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বৃহস্পতিবার দুই দফা হামলায় তিনজন সৌদি নাগরিক…
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে পরিচিতি পেয়েছেন শামীম…
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপির বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা…
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের হলবর্ন ও সেন্ট প্যানক্রাস আসনের উপনির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী সাগাল আবদি-ওয়ালির কাছে পরাজিত…
দ্রুত বদলে যাওয়া রূপগঞ্জ এখন শিল্পায়ন ও আবাসন প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। উন্নয়নের এই গতিপথের পাশাপাশি…
This website uses cookies.