Header Premium (728×90)

Categories: বিনোদন

গোপন সূচির রোমাঞ্চ নিয়ে বসছে ৫৩তম টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসব

কলোরাডোর সান জুয়ান পর্বতমালার কোলে অবস্থিত ছোট্ট পাহাড়ি শহর টেলুরাইড। প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শুরুতে এই শান্ত শহরটির চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। রাস্তাঘাটে মানুষের আনাগোনা বাড়ে, হোটেলগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, আর ক্যাফেগুলোতে অপরিচিত মানুষেরা মেতে ওঠেন সিনেমা নিয়ে নানা আড্ডায়। ২০২৬ সালের ৪ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর এই পাহাড়ি শহরেই বসতে যাচ্ছে ‘৫৩তম টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসব’। চার দিনের এই উৎসবটি আর দশটি বড় চলচ্চিত্র উৎসবের চেয়ে একেবারেই আলাদা।

এখানে দর্শকেরা টিকিট কাটেন, যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন এবং পাহাড় পেরিয়ে উৎসবে পৌঁছান কেবলই এক পুরোনো বিশ্বাসের ওপর ভর করে। কারণ, উৎসব শুরু হওয়ার আগে কোনো সিনেমার নাম বা অনুষ্ঠানসূচি প্রকাশ করা হয় না। আয়োজকেরা অত্যন্ত সচেতনভাবেই এই গোপনীয়তা বজায় রাখেন। দর্শককে প্রথমে এখানে আসতে হয়, আর তারপর তিনি জানতে পারেন কোন সিনেমাটি তিনি দেখতে যাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই ছোট শহরটিতে প্রতিবছর লেবার ডে উইকএন্ডে উৎসব শুরু হলে জনসংখ্যা সাময়িকভাবে প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পায়। উৎসবের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, এখানে ৭,৮০০ জনের বেশি চলচ্চিত্রপ্রেমী আসেন এবং এই সংখ্যা কখনো কখনো ৬০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০২৬ সালের এই আয়োজনে সিনেমা দেখানোর জন্য মোট ১১টি স্ক্রিনের ব্যবস্থা থাকবে। এর মধ্যে দুটি থাকবে উন্মুক্ত আকাশের নিচে এবং ছয়টি স্ক্রিন বিশেষভাবে এই উৎসবের জন্যই নির্মাণ করা হচ্ছে।

তবে এই সংখ্যাগুলো দিয়ে টেলুরাইড উৎসবের আসল রূপ বোঝা কঠিন। এই উৎসবের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সকালে এক কাপ কফি হাতে দূরে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকার মধ্যে, যেখানে পাশের দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি হতে পারেন কোনো প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক, পরিচালক কিংবা সাধারণ কোনো দর্শক। তারপর হঠাৎ হলের দরজা খুলে যায়, আলো নিভে যায় এবং কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই শুরু হয় সিনেমার এক নতুন জগতের আবিষ্কার।

আজকের দিনে যেখানে যেকোনো বড় উৎসবের কয়েক সপ্তাহ আগেই ট্রেলার, পোস্টার, সাক্ষাৎকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা থেকে জানা যায় কোন সিনেমার ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হচ্ছে বা কোন তারকা পুরস্কারের দৌড়ে আছেন, সেখানে টেলুরাইড একেবারেই ব্যতিক্রম। এই উৎসবের মূল আকর্ষণই হলো—উদ্বোধনের ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত সবকিছু গোপন রাখা। ২০২৬ সালেও এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হচ্ছে না এবং উৎসবের অফিশিয়াল প্রোগ্রাম গাইডে সরাসরি লেখা রয়েছে ‘ইটস এ সিক্রেট’। আগে থেকে জানার চেয়ে অজানাকে আবিষ্কার করার এই আনন্দ উদযাপন করতেই এখানে সমবেত হন সবাই।

এই উৎসবের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ‘ব্লু ভেলভে’, ‘স্ট্রেঞ্জার দ্যান প্যারাডাইস’, ‘কাউচিং টাইগার, হিডেন ড্রাগন’, ‘টক টু হা’, ‘ব্রোকব্যাক মাউন্টেন’, ‘ক্যাপোট’, ‘জুনো’, ‘স্লামডগ মিলিয়নেয়ার’ এবং ‘দ্য কিংস স্পিচ’–এর মতো বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রগুলো প্রথমবার দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল এই টেলুরাইড। তাই এখানে সিনেমা দেখার অর্থ হলো সেই আবিষ্কারের মুহূর্তটির অংশ হয়ে ওঠা।

এবারের ৫৩তম উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ব্রিটিশ-আমেরিকান অভিনেত্রী, লেখক ও পরিচালক রেবেকা হল। ২০২৬ সালের উৎসবের জন্য তাঁকে ‘গেস্ট ডিরেক্টর’ হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। টেলুরাইডের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতিবছর একজন চলচ্চিত্রপ্রেমী শিল্পীকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়, যিনি নিজের পছন্দের চলচ্চিত্র নির্বাচন করে উৎসবের নতুন সিনেমার পাশাপাশি একটি ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র-ইতিহাস তুলে ধরেন। রেবেকা হল এবার উৎসবের জন্য ছয়টি সিনেমা নির্বাচন করবেন, তবে সেই সিনেমাগুলোর নামও যথারীতি আগে থেকে প্রকাশ করা হচ্ছে না।

‘দ্য প্রেস্টিজ’, ‘ভিকি ক্রিস্টিনা বার্সেলোনা’, ‘ক্রিস্টিন’ কিংবা ‘প্যাসি’–এর মতো চলচ্চিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণেও হাত দিয়েছেন তিনি। ফলে তাঁর নির্বাচিত এই ছয়টি সিনেমার মধ্যে অভিনয়, স্মৃতি, নারীর অভিজ্ঞতা নাকি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ ফুটে উঠবে, তা জানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দর্শকেরা।

উৎসবের আরেকটি দৃশ্যমান পরিচয় ফুটিয়ে তুলেছেন ব্রিটিশ ডিজাইনার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক কিউরেটর বেলা ফ্রয়েড। তিনি এবারের উৎসবের অফিশিয়াল পোস্টার ডিজাইন করেছেন। ফ্যাশন ও সংস্কৃতির নানা শাখায় কাজ করা ফ্রয়েড তাঁর ‘গিন্সবার্গ ইজ গড’ এবং ‘১৯৭০’–এর মতো শব্দ-নির্ভর পোশাক ডিজাইনের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

টেলুরাইডের জন্য তৈরি তাঁর পোস্টারটি কেবল একটি উৎসবের বিজ্ঞাপন নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে কৌতূহল, রহস্য ও গল্পের প্রতি এক গভীর আকর্ষণ। বেলার ভাষায়, চলচ্চিত্র হলো আধুনিক পুরাণের মতো এবং টেলুরাইড এমন এক জায়গা যেখানে একটি সাধারণ কথোপকথনও মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে।

টেলুরাইড মূলত একটি অপ্রতিযোগিতামূলক উৎসব। এখানে কোনো পুরস্কার দেওয়ার প্রতিযোগিতা থাকে না, বরং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্রকে এক সুতোয় গাঁথাই এর মূল লক্ষ্য। এ কারণে উৎসবের এক প্রান্তে যেমন নতুন পরিচালকের সদ্য নির্মিত ডকুমেন্টারি দেখানো হয়, তেমনি অন্য প্রান্তে হয়তো স্থান পায় বহু বছর আগে তৈরি এবং প্রায় বিস্মৃত কোনো পুনরুদ্ধার করা নীরব চলচ্চিত্র।

নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার বাইরেও রাস্তার মোড়ে, লাইনে দাঁড়িয়ে কিংবা সিনেমা হলের সামনে পরিচালক, অভিনেতা, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও সাধারণ দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত আলাপচারিতাই এই উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

প্রতিযোগিতামূলক না হলেও এই উৎসবের একটি অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। এখান থেকে কোনো সিনেমা দেখে দর্শকেরা যখন কথা বলা শুরু করেন, সেই আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে সাংবাদিকদের মাধ্যমে এবং পরবর্তী সময়ে টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়ে তা অস্কারের মতো বড় বড় পুরস্কারের পূর্বাভাস তৈরি করে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব চলবে ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর, টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হবে ১০ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর এবং স্ক্রিন-এর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী টেলুরাইড ৩ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হলেও উৎসবের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী এর তারিখ ৪ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর।

ক্যালেন্ডারের এই হিসাবই বলে দেয় টেলুরাইডের গুরুত্ব কতটা বেশি। ভেনিস, টেলুরাইড এবং টরন্টো—এই তিনটি ভিন্ন পরিবেশ ও ভিন্ন ঘরানার দর্শকক্ষেত্রের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এই ছোট্ট পাহাড়ি শহরটি, যা তার সিনেমার তালিকা গোপন রাখে।

এর কারণ হিসেবে মনে করা হয়, সিনেমা দেখার আগে অতিরিক্ত তথ্য দর্শকদের দেখার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। তখন মানুষ চরিত্রের চেয়ে অভিনেতাকে বেশি দেখে, দৃশ্যের চেয়ে ট্রেলার মনে রাখে এবং গল্পের চেয়ে সমালোচকদের মতামতের ওপর নির্ভর করে। টেলুরাইড সেই প্রস্তুত দৃষ্টিকে সরিয়ে দিয়ে অজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সিনেমাকে নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগ করে দেয়।

৭ সেপ্টেম্বর উৎসবের সমাপ্তির পর স্ক্রিনগুলো খুলে ফেলা হবে, অস্থায়ী কাঠামোগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে এবং শহরটি আবার তার স্বাভাবিক শান্ত রূপে ফিরে যাবে। রাস্তায় সিনেমা নিয়ে মুখরিত কোলাহলের জায়গায় জায়গা করে নেবে পাহাড়ের ঠান্ডা হাওয়া। তবে দর্শকদের মনে থেকে যাবে কোনো সিনেমার অবিস্মরণীয় দৃশ্য, কোনো পরিচালকের বিশেষ একটি বাক্য কিংবা এমন একটি সিনেমা যার নাম উৎসবে আসার আগে কেউ জানত না। আর এভাবেই টেলুরাইডের নিজস্ব দর্শন সত্য হয়ে উঠবে—প্রথমে আপনাকে সেখানে যেতে হবে, তারপর সিনেমা নিজেই আপনাকে খুঁজে নেবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

Recent Posts

টঙ্গীতে এসেনশিয়াল ড্রাগসের কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে ২১ ইউনিট

গাজীপুরের টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় অবস্থিত এসেনশিয়াল ড্রাগস লিমিটেড কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার…

5 minutes ago

ভারতে ককরোচ পার্টির দুই নেতা পাঁচ দিনের জেল হেফাজতে

দিল্লির যন্তর মন্তরে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ ও বিক্ষোভের ঘটনায় ককরোচ জনতা পার্টির দুই নেতাকে পাঁচ…

8 minutes ago

ট্রাম্পকে ‘স্বামী’ সম্বোধন করে বিব্রত নতুন প্রেস সচিব কেটি জ্যাকারিয়া

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন প্রেস সচিব কেটি জ্যাকারিয়া তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ভুলবশত ট্রাম্পকে…

12 minutes ago

তারেক রহমান সরকারের মেয়াদের মাঝামাঝি: সম্ভাবনা ও নীতিগত অগ্রাধিকার

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রাপ্তি ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলো পর্যালোচনার…

15 minutes ago

তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষার আহ্বান প্রেসিডেন্টের

দেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে রক্ষা করতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের আহ্বান…

1 hour ago

২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় আসছে পরিবর্তন

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ নতুন বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগ…

1 hour ago

This website uses cookies.