আড়াইশ বছরের ঐতিহ্য, ভোলার যে বাজারে চলে এখনো খাজনা মুক্ত পশু বেচাকেনা
- আপডেট সময় : ০৪:৪২:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে

নুপুর আক্তার,
নিজস্ব প্রতিনিধি:
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি, এরই মধ্যে জমে উঠতে শুরু করেছে ভোলার স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে দেড় শতাধিক পশুর হাট, প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন হাটে বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি, ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
তবে এসব হাটের মধ্যে ব্যতিক্রমী ঐতিহ্য ও বিশেষ ব্যবস্থাপনার কারণে আলাদা ভাবে পরিচিত ভোলা জেলা সদর উপজেলার গজারিয়া বাজার পশুর হাট, স্থানীয়দের কাছে এটি বেশি পরিচিত মিয়া বাড়ীর দরজার হাট নামে।
প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো এ ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট বসে ভোলা জেলা সদর উপজেলার উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে গজারিয়া বাজার সংলগ্ন বালিয়া মিঞা বাড়ির সামনের বিশাল খোলা মাঠে সপ্তাহে ৩ দিন শনিবার, সোমবার ও বুধবার বসে এই হাট, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদকে কেন্দ্র করে এখন এখানে বেড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি।
প্রতিটি হাটেই কয়েক কোটি টাকার গরু, মহিষ ও ছাগল কেনাবেচা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ হাটের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এখানে ক্রেতা কিংবা বিক্রেতার কাছ থেকে কোনো ধরনের টোল, খাজনা, গাজনা কিংবা চাঁদা নেয়া হয় না, ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা খামারি ও ব্যাপারীরা নির্বিঘ্নে পশু বিক্রি করতে পারেন এবং ক্রেতারাও স্বাচ্ছন্দ্যে পশু কিনতে পারেন, খোলা পরিবেশ, নিরাপদ বেচাকেনা, দালাল মুক্ত ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত খরচ না থাকায় হাটটি এখন ভোলা সহ আশপাশের জেলার মানুষের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভোলা জেলার চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, দৌলতখান, চরপাতা ও ভোলা সদরের ভেলুমিয়া, আলীনগর, চরসামাইয়া, বাঘমারা, রাজাপুর ও চর চন্দ্রপ্রসাদ সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দেশিয় প্রজাতির গরু ও ছাগল নিয়ে আসছেন, খামারি ও ব্যবসায়ীরা।
ছোট, বড় ও মাঝারি সব ধরনের পশু পাওয়া যাওয়ায় হাটজুড়ে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে, শুধু মাঠই নয়, আশপাশের রাস্তাঘাট পর্যন্ত পশুতে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, হাটের আগের দিন থেকেই বিক্রেতারা মাঠে খুঁটি পুঁতে নিজেদের জায়গা নির্ধারণ করে রাখেন।
গরু বিক্রি করতে আসা লোকমান হোসেন বলেন, গজারিয়া বাজার ভোলার ঐতিহ্যবাহী কোরবানির পশুর হাট, মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুর পূর্বপুরুষরা এ হাট খাজনা মুক্ত করে গিয়েছেন, তাই আমরা এখানে গরু নিয়ে আসি, অন্য হাটে টাকা দিতে হয়, এখানে পুরো বিক্রির টাকাই হাতে পাই।
ভেলুমিয়া থেকে আসা ব্যাপারী রমিজল বলেন, এই হাটে সপ্তাহে ৩ দিন হাট বসে, এখানে কোনো চাঁদাবাজি নাই, গাজনা নাই, তাই আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে গরু বিক্রি করতে পারি।
খামারি মাহফুজ জানান, এ হাটে আশপাশের ইউনিয়ন ও চরাঞ্চল থেকে এখানে দেশি গরু আসে, প্রাকৃতিক ভাবে লালন-পালন করা গরু হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহও বেশি, অন্য হাটে লাখে প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খাজনা দিতে হয়, এখানে এ বাজারে সম্পূর্ণ খাজনা মুক্ত হওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই খুশি।
বিক্রেতা আলমগীর ব্যাপারী বলেন, এই হাটটি অনেক পুরনো, মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জু মিয়ার পূর্বপুরুষরা হাটটি খাজনা মুক্ত করেছিলেন, তাই এখানে বেচাকেনাও ভালো হয়, ক্রেতাদের মধ্যেও রয়েছে সন্তুষ্টি।
ক্রেতা সোয়েব বলেন, আমরা প্রতি বছর এ হাট থেকেই গরু ক্রয় করি, এ বছর দাম কিছুটা বেশি হলেও পছন্দের গরুটি পেয়েছি।
আরেক ক্রেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, গজারিয়া হাটে ছোট-বড় সব ধরনের গরু পাওয়া যায়, বিশেষ করে চরাঞ্চলের দেশি গরু গুলো দেখতে ভালো লাগে, দামও তুলনা মূলক ভাবে সাধ্যের মধ্যে থাকে, কোন ধরনের ঝামেলা নেই।
হাটের ইতিহাস তুলে ধরে মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুর চাচাতো ভাই জামাল মিয়া বলেন, প্রায় আড়াইশো বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ আরব আলী মিঞা কোরবানির পশু কিনতে দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বাংলাবাজার খাষেরহাটে গিয়েছিলেন, পশু কেনার পর খাজনা আদায় নিয়ে তিনি বিড়ম্বনায় পড়েন, বিষয়টি তার আত্মসম্মানে আঘাত করে, পরে তিনি মিঞা বাড়ির সামনের মাঠে খাজনা মুক্ত পশুর হাট চালু করেন, সেই থেকেই এ হাটের যাত্রা শুরু।
তিনি আরও বলেন, আজও সেই ঐতিহ্য ধরে রাখা হয়েছে, এখানে কোনো খাজনা বা চাঁদা নেয়া হয় না, ঈদের সময় হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে এখানে, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এখন প্রতিদিনই প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠছে গজারিয়া পশুর হাট।
শতবর্ষের ঐতিহ্য, খাজনামুক্ত বেচাকেনা ও নিরাপদ পরিবেশের কারণে ভোলা জেলার অন্যতম জনপ্রিয় কোরবানির পশুর হাটে পরিণত হয়েছে এ মিয়া বাড়ীর দরজার হাট।

























