ঢাকা ০৭:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পরশুরামে স্কুল শিক্ষার্থী বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটে মৃত্যু নওগাঁয় খাবারের প্রলোভনে শিশুকে ধর্ষণ রূপগঞ্জে ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা, আহত ৪, লুট ১২ লক্ষাধিক টাকার মালামাল জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও বাড়েনি গণপরিবহনের ভাড়া সুনামগঞ্জের বিদ্যুতের মেরামত করতে গিয়ে কৃষকের মৃত্যু নেত্রকোনায় স্ত্রীর হাত-পায়ের রগ কেটে দেয়ার অভিযোগে স্বামী আটক নগরীর আইডিয়াল মোড় সংলগ্ন মহাসড়কে বাসচাপায় ঠিকাদার নিহত খুলনায় নিজ রাইফেলের গুলিতে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা বৈশাখের ঝড় ও বজ্রপাতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতির আশংকা কৃষি জমির টপসয়েল কাটা বাধা দিলেন ইউপি সদস্য রহিম উল্লাহ আমজাদহাটে জনমনে স্বস্তি

রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ৯৬ মিলিয়ন ডলারের নতুন সহায়তা

মোঃ মকবুলার রহমান নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৮:০৭:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ অক্টোবর ২০২৫ ১৬০ বার পড়া হয়েছে

রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ৯৬ মিলিয়ন ডলারের নতুন সহায়তা

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

মোঃ মকবুলার রহমান
নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় নতুন করে ৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দিচ্ছে ৬০ মিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাজ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ৩৬ মিলিয়ন ডলারের। ইউএনবি সুত্রে এমনটি জানা গেছে।

মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা বিষয়ক প্রথম উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে এ ঘোষণা আসে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক সম্মেলনের শুরুতেই বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি অবিচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘন গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তিনি জানান, বর্তমানে ৫০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু একই রকম অভিজ্ঞতার শিকার। শুধু বাংলাদেশের কক্সবাজারেই প্রায় ৮ লাখ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে আছে।

তার মতে, ২০২৫ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা এখনো মাত্র ১২ শতাংশ অর্থায়ন পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য ‘লজ্জাজনক’। সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।

মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। মিয়ানমারের ভেতরে আরও অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ, যৌন সহিংসতা, বিমান হামলা ও অনাহারের মতো ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তহবিল ফুরিয়ে আসায় শরণার্থীদের অপুষ্টি বেড়ে গেছে এবং অনেকে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় ঝুঁকছে।

মানবাধিকার পদদলিত

জাতিসংঘ মহাসচিবের ক্যাবিনেট প্রধান কোর্টনি রাট্রে বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সংকট লাখো মানুষের অধিকার ও মর্যাদাকে পদদলিত করছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করছে। তিনি তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান—
১. বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা
২. মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার সহজ করা
৩. শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা দেশগুলোর ওপর চাপ কমাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা

রোহিঙ্গা কর্মীদের দাবি

মিয়ানমার উইমেনস পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াই ওয়াই নু বলেন, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গার পরও নৃশংসতা থামেনি; বরং তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হত্যা, জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ, যৌন সহিংসতা ও অনাহার আজও অব্যাহত।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় মিয়ানমারে আর কোনো রোহিঙ্গা অবশিষ্ট থাকবে না। পাশাপাশি তিনি সীমান্ত পেরিয়ে মানবিক সহায়তা করিডর, লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা ও নৃশংসতার বিচার দাবি করেন।

আরাকান ইয়ুথ পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা রফিক হুসন জানান, জান্তা বাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষ-শিশুদের জোর করে সেনা বানিয়ে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। শুধু এক সপ্তাহেই অন্তত ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের মে মাসে এক হামলায় একদিনে ২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। তার মতে, এই সংকট সমাধান মানবতার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। শান্তির স্পষ্ট পথ নেই।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ মনে করেন, মিয়ানমারের বহুমুখী সংকট ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। যুদ্ধবিরতি না থাকায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি সতর্ক করেন, আসন্ন নির্বাচন বৈধতা নয়, বরং সহিংসতা বাড়াবে।

সমাপনী বার্তা সম্মেলনের সমাপ্তিতে সভাপতি বেয়ারবক বলেন, আট বছর ধরে রোহিঙ্গারা যে দুঃসহ জীবন ও অনিশ্চয়তা সহ্য করছে, তা মানবতার জন্য এক সতর্ক সংকেত। তিনি জানান, তাদের সহনশীলতা বিস্ময়কর হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এখনো যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে, রোহিঙ্গা কর্মীরা বলেন, শুধু ঘোষণা দিয়ে নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ওয়াই ওয়াই নুর ভাষায়—ন্যায়বিচার কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, সেটিই একমাত্র প্রতিরোধ এবং একমাত্র শান্তির পথ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

 

রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের ৯৬ মিলিয়ন ডলারের নতুন সহায়তা

আপডেট সময় : ০৮:০৭:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ অক্টোবর ২০২৫
print news

মোঃ মকবুলার রহমান
নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি:

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় নতুন করে ৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দিচ্ছে ৬০ মিলিয়ন ডলার এবং যুক্তরাজ্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ৩৬ মিলিয়ন ডলারের। ইউএনবি সুত্রে এমনটি জানা গেছে।

মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা বিষয়ক প্রথম উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে এ ঘোষণা আসে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক সম্মেলনের শুরুতেই বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি অবিচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘন গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তিনি জানান, বর্তমানে ৫০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু একই রকম অভিজ্ঞতার শিকার। শুধু বাংলাদেশের কক্সবাজারেই প্রায় ৮ লাখ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে আছে।

তার মতে, ২০২৫ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা এখনো মাত্র ১২ শতাংশ অর্থায়ন পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য ‘লজ্জাজনক’। সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন।

মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। মিয়ানমারের ভেতরে আরও অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। রোহিঙ্গারা জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ, যৌন সহিংসতা, বিমান হামলা ও অনাহারের মতো ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তহবিল ফুরিয়ে আসায় শরণার্থীদের অপুষ্টি বেড়ে গেছে এবং অনেকে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় ঝুঁকছে।

মানবাধিকার পদদলিত

জাতিসংঘ মহাসচিবের ক্যাবিনেট প্রধান কোর্টনি রাট্রে বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান সংকট লাখো মানুষের অধিকার ও মর্যাদাকে পদদলিত করছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করছে। তিনি তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান—
১. বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা
২. মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার সহজ করা
৩. শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা দেশগুলোর ওপর চাপ কমাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা

রোহিঙ্গা কর্মীদের দাবি

মিয়ানমার উইমেনস পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াই ওয়াই নু বলেন, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গার পরও নৃশংসতা থামেনি; বরং তা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হত্যা, জোরপূর্বক সেনা নিয়োগ, যৌন সহিংসতা ও অনাহার আজও অব্যাহত।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে একসময় মিয়ানমারে আর কোনো রোহিঙ্গা অবশিষ্ট থাকবে না। পাশাপাশি তিনি সীমান্ত পেরিয়ে মানবিক সহায়তা করিডর, লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা ও নৃশংসতার বিচার দাবি করেন।

আরাকান ইয়ুথ পিস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা রফিক হুসন জানান, জান্তা বাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষ-শিশুদের জোর করে সেনা বানিয়ে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। শুধু এক সপ্তাহেই অন্তত ৪০০ জন নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের মে মাসে এক হামলায় একদিনে ২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। তার মতে, এই সংকট সমাধান মানবতার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। শান্তির স্পষ্ট পথ নেই।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ মনে করেন, মিয়ানমারের বহুমুখী সংকট ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। যুদ্ধবিরতি না থাকায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি সতর্ক করেন, আসন্ন নির্বাচন বৈধতা নয়, বরং সহিংসতা বাড়াবে।

সমাপনী বার্তা সম্মেলনের সমাপ্তিতে সভাপতি বেয়ারবক বলেন, আট বছর ধরে রোহিঙ্গারা যে দুঃসহ জীবন ও অনিশ্চয়তা সহ্য করছে, তা মানবতার জন্য এক সতর্ক সংকেত। তিনি জানান, তাদের সহনশীলতা বিস্ময়কর হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এখনো যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে, রোহিঙ্গা কর্মীরা বলেন, শুধু ঘোষণা দিয়ে নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ওয়াই ওয়াই নুর ভাষায়—ন্যায়বিচার কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, সেটিই একমাত্র প্রতিরোধ এবং একমাত্র শান্তির পথ।