দমন-পীড়ন ও চরম সন্ত্রাসী হামলায় গভীর সংকটে পাকিস্তান সরকার
- আপডেট সময় : ০৮:৩৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে ইমেজ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করলেও দেশের অভ্যন্তরে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সন্ত্রাসী হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পাকিস্তান। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মক্কা জোট গঠন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ থামানোর দৌড়ঝাঁপ এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে মূলত দেশের নাজুক পরিস্থিতি আড়াল করার চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসী হামলা এবং অন্যদিকে বিরোধী দলের ওপর নির্মম দমন-পীড়ন দেশটিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক দুরবস্থা তো পাকিস্তানের চিরসঙ্গী হিসেবে রয়েই গেছে।
সাধারণত তৃতীয় বিশ্বের স্বৈরশাসকরা দুটি বয়ান ব্যাপকভাবে প্রচার করে থাকে—উন্নয়নের জিকির এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে কূটনৈতিক সাফল্যের গীত গাওয়া। পাকিস্তানও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৯৬০-এর দশকে উন্নয়নের গীত গাইতে গাইতে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান পাকিস্তানের ভাঙন অনিবার্য করেছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, জনগণকে অবরুদ্ধ করে উন্নয়নের জয়গান কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাগাড়ম্বর কার্যত হিতে বিপরীত অবস্থা ডেকে আনে। তা ছাড়া জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছাড়া সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কোনো কাজে আসে না, যার প্রমাণ ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর শোচনীয় পরাজয়।
বর্তমানে পাকিস্তানে আবারও একই ধরনের দৃশ্য ফুটে উঠেছে, যেখানে একজন ফিল্ড মার্শাল পেছন থেকে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছেন। নওয়াজ মুসলিম লীগ ও পিপিপির যৌথ সরকারের মূল চালিকাশক্তি হলেন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিফ মুনির। এই তিন শক্তি মিলে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে এমন এক কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে, যা দেশটির জনগণের গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে।
আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা এবং ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পিটিআইয়ের নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের চরম নির্যাতন ও নিপীড়ন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে খাইবার পাখতুনখোয়ার আমন মেলা এলাকায় একটি যৌথ পুলিশ ও শুল্কচৌকিতে বিস্ফোরকবোঝাই ট্রাক্টর দিয়ে ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়, যাতে অন্তত ১০ জন নারী ও শিশু নিহত হয়। এছাড়া কোহাটের একটি পুলিশ চেকপোস্টেও একই ধরনের হামলা চালানো হয়েছে।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসেই খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ২ হাজার ৪৫৬টি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় ৪৭২ জন নিরাপত্তাকর্মী এবং ১ হাজার ৫০০ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে, বেলুচিস্তান প্রদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিসহ (বিএলএ) অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর চোরাগোপ্তা হামলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা অভিযানে পুরো প্রদেশ অশান্ত হয়ে উঠেছে।
এই চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে যেখানে জনগণকে সাথে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার কথা, সেখানে সরকার বিরোধী দলকে জব্দ করতে দমননীতি অনুসরণ করছে। কারাবন্দি ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআই লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করার পর দেশজুড়ে গণগ্রেপ্তার শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পদক্ষেপকে মৌলিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইমরান খানের বড় ছেলে সোলেমান খান অভিযোগ করেছেন, সরকার সম্পূর্ণ ফ্যাসিবাদী কায়দায় তার পরিবারের ওপর ক্র্যাকডাউন চালাচ্ছে, যা মূলত আন্দোলনকে দমন করার অপচেষ্টা।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পিটিআইয়ের লংমার্চ ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে দলটির ১ হাজার ৫০০-এর বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি পার্লামেন্ট লজের ভেতর থেকে পাঁচজন এমএনএকে প্রতিরোধমূলক আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাঞ্জাবসহ দেশের প্রধান প্রধান প্রদেশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। সরকার জঙ্গি হামলার আশঙ্কার কথা বললেও বিরোধী দল একে আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চরম রূপ হিসেবে লাহোর থেকে ইমরান খানের তিন বোন—হালিমা খান, উজমা খান ও নুরিন নাজিয়াকে ৩০ দিনের জন্য প্রশাসনিক হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
এই ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে পিটিআই তাদের ২৭ সেপ্টেম্বরের পরিকল্পিত Islamabad লংমার্চ কর্মসূচি স্থগিত করে ৪ অক্টোবর নতুন তারিখ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা, একদিকে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং অন্যদিকে রাজপথে বিরোধী শক্তিকে দমন করার এই দ্বিমুখী নীতি পাকিস্তানের বর্তমান শাহবাজ শরিফ সরকারকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।



























