আল-জাহিজের খাজানা: জেরুজালেম থেকে আম্মানে এক বইয়ের মহাকাব্য
- আপডেট সময় : ১০:১১:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে

ইতিহাসের একটি বড় ভুল হলো অতীতকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘরে আটকে রাখা। পুরোনো বইয়ের দোকানে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়, অতীত ধুলোমাখা তাকের ওপর বা পুরোনো কাগজের গন্ধে জীবন্ত হয়ে থাকে। এমন একটি অনন্য প্রতিষ্ঠানের নাম ‘আল-জাহিজের খাজানা’। একে কেবল একটি বইয়ের দোকান বললে এর গভীরতা বোঝা অসম্ভব, কারণ এর গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফিলিস্তিন, জেরুজালেম, আরবি সাহিত্য এবং নির্বাসনের ইতিহাস।
এই প্রতিষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল ১৮৯৩ সালের দিকে উসমানি শাসিত কারাকে। সালমান আল-মায়েতাহ ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা, যিনি ছিলেন লিপিকার ও সংগ্রাহক। সে সময়ে বই কেবল পণ্য ছিল না, বরং তা ছিল জ্ঞান ও স্মৃতির আধার। ১৯২১ সালে খলিল আল-মায়েতাহ জেরুজালেমে পারিবারিক এই ব্যবসাকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেন। তৎকালীন জেরুজালেমের বৈচিত্র্যময় পরিবেশে দোকানটি ছিল আরবি সাহিত্য, পাণ্ডুলিপি ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। খলিলের মৃত্যুর পর ১৯৪৭ সালে সংঘাতের সময় দোকানটি পুড়ে গেলেও কিছু পাণ্ডুলিপি রক্ষা পায়।
১৯৪৮ সালে খলিলের ছেলে মামদুহ আল-মায়েতাহ অবশিষ্ট বইগুলো নিয়ে আম্মানে চলে যান। এই যাত্রাকে কেবল স্থানান্তর বলা যায় না, এটি ছিল একটি বহনযোগ্য মাতৃভূমি তৈরির প্রচেষ্টা। আম্মানে এসে তিনি দোকানটিকে একটি ঋণগ্রন্থাগারে পরিণত করেন, যেখানে বই কেবল ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিল না, বরং পাঠ ছিল সামাজিক অধিকার। ২০১৮ সালের এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ হাজারের বেশি বই ও তিন হাজার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়ে যায়। তবে বইয়ের মানুষদের জেদ ছিল অটুট; ২০২১ সালে দোকানটি সংস্কার করে পুনরায় খুলে দেওয়া হয়।
আল-জাহিজের খাজানা নামের এই ‘খাজানা’ বা ভাণ্ডারটি মূলত একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—‘এটি হারিয়ে গেলে কী হারাবে?’। বই যখন কেবল পণ্য না হয়ে স্মৃতি হয়ে ওঠে, তখনই তা সংরক্ষণের সংস্কৃতি তৈরি হয়। আব্বাসীয় যুগের লেখক আল-জাহিজের নামানুসারে এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে, যিনি ক্ষুদ্রতম বস্তুর মধ্যেও বিশাল সভ্যতা অনুসন্ধানের শিক্ষা দিয়েছিলেন। আজ এই দোকানটি কেবল একটি ব্যবসার নাম নয়, বরং এটি একটি জাতির স্মৃতির অবিনাশী গ্রন্থাগার, যা তার অনুপস্থিতির মধ্যেও অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করে।



























