Header Premium (728×90)

Categories: ধর্ম

দুশ্চিন্তা মুক্তি ও গুনাহ মাফে দরূদ পাঠের অসীম ফজিলত

ইসলামে দরূদ পাঠের গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। এটি কেবল একটি নফল আমল নয়, বরং মহান আল্লাহর নির্দেশ এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার অনন্য বহিঃপ্রকাশ। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ কর।" এই ঐশী নির্দেশনাই প্রমাণ করে যে, দরূদ পাঠ আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় একটি ইবাদত।

অনেকের মুখে একটি প্রচলিত কথা শোনা যায় যে, "এত দরূদ পড়ো যেন হাশরের মাঠে জিহ্বা সাক্ষ্য দেয় যে তুমি সবচেয়ে বেশি দরূদ পড়েছ।" ধর্মীয় গবেষকদের মতে, উপদেশ হিসেবে এটি ভালো হলেও এটি কোনো সহিহ হাদিস নয়। তাই একে হাদিস হিসেবে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে সহিহ হাদিসসমূহে দরূদ পাঠের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, যা মুমিনদের এই আমলের প্রতি গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

সুনান আন-নাসাঈর ১২৯৭ নম্বর হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করেন।" (ইমাম আলবানী রহ. এটিকে সহিহ বলেছেন)। সেই হিসেবে কোনো ব্যক্তি যদি দৈনিক ১০০ বার দরূদ পাঠের অভ্যাস করেন, তবে তিনি আল্লাহর অগণিত রহমত, ক্ষমা ও উচ্চ মর্যাদা লাভের অধিকারী হতে পারেন। এ কারণেই সালাফে সালেহীন বা পূর্বসূরি পুণ্যবান ব্যক্তিরা দরূদকে তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য আমল বানিয়ে নিয়েছিলেন।

পরকালের কঠিন সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নৈকট্য লাভের অন্যতম বড় মাধ্যম হলো দরূদ। জামি' আত-তিরমিযীর ৪৮৪ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরূদ পাঠ করেছে।" এছাড়া আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, "যে ব্যক্তি সকালে দশবার এবং সন্ধ্যায় দশবার আমার ওপর দরূদ পাঠ করবে, কিয়ামতের দিন সে আমার শাফাআত লাভ করবে।" তবে অনেক মুহাদ্দিস এই হাদিসটির সনদে দুর্বলতা উল্লেখ করেছেন, তাই এটি নিশ্চিত ফজিলত হিসেবে নয়, বরং একটি সহায়ক বর্ণনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

দরূদ পাঠের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি দোয়া কবুলের প্রধান চাবিকাঠি। দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, "দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলে থাকে; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পাঠ না করা পর্যন্ত তা উপরে ওঠে না।" (জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ৪৮৬)। এ কারণে যেকোনো দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরূদ পাঠ করা অত্যন্ত উত্তম আমল। বিপরীতভাবে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম শুনেও দরূদ না পড়াকে কৃপণতা ও চরম বঞ্চনা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। জামি' আত-তিরমিযীর ৩৫৪৬ নম্বর সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে, "কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করল না।"

মানুষের পার্থিব জীবনের যাবতীয় দুশ্চিন্তা দূর করতেও দরূদ অত্যন্ত কার্যকর। সাহাবি হযরত উবাই ইবন কা'ব (রা.) একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জানতে চান যে, তিনি তাঁর দোয়ার কতটুকু অংশ দরূদের জন্য নির্ধারণ করবেন। একপর্যায়ে তিনি যখন বলেন, "আমি যদি আমার সমস্ত দোয়াই আপনার ওপর দরূদে ব্যয় করি?" তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন, "তাহলে তোমার সব চিন্তা দূর হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।" (জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ২৪৫৭)।

দরূদ কেবল মুখে উচ্চারণের বিষয় নয়, এটি রাসুলের আদর্শ ও সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার। তাই বেশি বেশি দরূদ পড়ার পাশাপাশি নিজের জীবনকে তাঁর আদর্শ অনুযায়ী সাজানো আবশ্যক। বিশেষ করে সপ্তাহের জুমার দিন ও রাতে দরূদ পাঠের প্রতি তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সুনান আবু দাউদের ১০৪৭ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। তাই এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করো।"

অতএব, লোকদেখানো উদ্দেশ্যে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমাদের নিয়মিত দরূদ পাঠ করা উচিত। দরূদে ইব্রাহিম হলো সবচেয়ে উত্তম দরূদ: "اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّদٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ।" মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিয়মিত দরূদ পাঠের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ অর্জন করার তাওফিক দান করুন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh

Recent Posts

১৮টি দেশ চিহ্নিত করে রপ্তানি বাড়াতে সরকারের নতুন কর্মপরিকল্পনা

দেশের রপ্তানি খাতকে আরও গতিশীল, শক্তিশালী ও টেকসই করতে নতুন কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। বাণিজ্য…

4 minutes ago

হুথিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের ঘোষণা ইয়েমেন সরকারের

ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হটিয়ে হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ড পুনর্দখলে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন ইয়েমেনের…

5 minutes ago

ঝিনাইগাতীতে কালভার্ট ভেঙে চরম জনদুর্ভোগ, ঝুঁকি নিয়ে চলছে চলাচল

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ভারুয়া কুশাইকুড়া সড়কের একটি কালভার্ট ভেঙে পড়ায় স্থানীয় তিন হাজার মানুষ চরম…

12 minutes ago

পর্তুগালের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে রোনালদো এক বিশাল সম্পদ: অর্থমন্ত্রী

পর্তুগালের অর্থমন্ত্রী মানুয়েল কাস্ত্রো আলমিদা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে বিশ্বমঞ্চে দেশটির ভাবমূর্তি উজ্জ্বলকারী এবং সবচেয়ে বড় সম্পদ…

12 minutes ago

রেল খাতকে লাভজনক করতে মালবাহী ক্যারেজ বাড়ানোর পরামর্শ স্থায়ী কমিটির

রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে রেল খাতকে লোকসান থেকে লাভজনক করতে যাত্রীবাহী ক্যারেজের…

13 minutes ago

কিশোরগঞ্জে হিমাগারের অতিরিক্ত ভাড়ায় দিশেহারা আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে সরকার নির্ধারিত হিমাগার ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন চাষিরা। বাজারে আলুর…

15 minutes ago

This website uses cookies.