Header Premium (728×90)

ব্রহ্মপুত্র দিয়ে আসাম থেকে বাংলাদেশে আসছে ৫৪০ টন মিথানল

দেশভাগের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া আসামের ডিব্রুগড় ও বাংলাদেশের ঢাকার মধ্যকার ঐতিহাসিক নৌপথটি দীর্ঘ প্রায় সাত দশক পর আবার সচল হয়েছে। সোমবার আসামের বগীবিল বন্দর থেকে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের একটি জাহাজে করে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। ডেকান হেরাল্ডের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের এই নৌপথটি পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নদীপথে বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।

ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল সোমবার এই মিথানলবাহী জাহাজের আনুষ্ঠানিক যাত্রা উদ্বোধন করেন। ভার্চুয়ালি এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সর্বানন্দ সনোয়াল আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, আমাদের দাদা-দাদিরা ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে বড় হয়েছেন। ৭০ বছর ধরে, যখন ঘাটটি বন্ধ ছিল, সেই বাঁশির শব্দ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং জাহাজ আসাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি আরও যোগ করেন, ডিব্রুগড় থেকে পুনরায় একটি জাহাজ বিশ্বের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছে এবং নদী কখনোই তাদের ব্যর্থ করেনি, কেবল একে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছার অভাব ছিল।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই যাত্রাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বলেন, আসামের নিজস্ব পণ্য এখন নিজেদের নদীপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে। তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভারতের পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে উল্লেখ করেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূলত ব্রহ্মপুত্র নদকে উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে বিদেশি বাজারে পণ্য পরিবহনের একটি বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করিডর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতেই এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে নিয়মিত মিথানল পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সম্প্রতি বগীবিল ও ধুবড়িতে কাস্টমস ও অভিবাসন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এই চালান পাঠানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

একসময় পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর ছিল ডিব্রুগড়। ১৮৫৬ সাল নাগাদ কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার এই শহরে আসত। ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে ‘ডিব্রু-সাদিয়া রেলওয়ে’ চলাচল শুরু করে এবং ১৯১৩ সাল নাগাদ প্রতিদিন স্টিমার ব্রহ্মপুত্র দিয়ে ডিব্রুগড়ে যাতায়াত করত। এসব স্টিমারে মূলত চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহন করা হতো। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এই নৌপথে ছেদ ঘটে। ফলে আসামের পণ্য কলকাতায় পৌঁছাতে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে ডিব্রুগড় এলাকায় নদীর তলদেশের গঠনে পরিবর্তন আসে এবং ১৯৫৪ সালে নিয়মিত পণ্য বুকিং বন্ধ হয়ে যায়। এরপর চা পরিবহন রেলপথে স্থানান্তরিত হওয়ায় ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ডিব্রুগড় ঘাটটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে এই আন্তঃসীমান্ত নদীপথের বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশ নদীপথে বাণিজ্যের জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল স্বাক্ষর করে। ১৯৮৮ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে ভারতের ‘জাতীয় জলপথ-২’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হতে আরও কয়েক দশক সময় লেগে যায়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে গুয়াহাটির পান্ডু থেকে পশ্চিম আসামের ধুবড়ি পর্যন্ত সিমেন্ট পরিবহনের মাধ্যমে এই নৌপথে নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়। ধুবড়ি মূলত নদী ও সড়কপথে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাটা স্টিলের বার্জ বাংলাদেশ হয়ে পান্ডুতে পৌঁছায় এবং ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ নামের একটি নদীভ্রমণ জাহাজ বাংলাদেশ হয়ে বারাণসী থেকে ডিব্রুগড়ে যায়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালটি চালু করা হয়, যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুলাইয়ে।

সর্বানন্দ সনোয়ালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ টনে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলপথের উন্নয়নে ভারত সরকার ৭৭ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে জাতীয় জলপথ-২-এর উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামতের সুবিধা এবং পান্ডু বন্দরের সঙ্গে শেষ মাইলের যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সনোয়াল বলেন, নদীপথে পণ্য পরিবহনে জ্বালানি খরচ যেমন কমে, তেমনি মহাসড়কে ট্রাকের চাপও হ্রাস পায়। এই আঞ্চলিক জলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে ভারত। বর্তমান এই নৌযাত্রায় ভারতের ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া, আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস, কোচিন বাঙ্কার্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশীদার প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

Recent Posts

নড়াইলে মাদক নিয়ে বিরোধে পাঁচ মামলার আসামি কুপিয়ে হত্যা

নড়াইলের নড়াগাতী থানার জয়নগর ইউনিয়নের দেবদুন গ্রামে মাদক বেচাকেনার দ্বন্দ্বে আরাফাত মোল্যা নামে এক ব্যক্তিকে…

3 minutes ago

শিশুদের শৈশব নিরাপদ ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের

শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে ডা. জুবাইদা রহমান শিশুদের নিরাপদ শৈশব…

6 minutes ago

নাটোরের নলডাঙ্গায় নারী উদ্যোক্তাকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেফতার ১

নাটোরের নলডাঙ্গায় এক নারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মালিককে যৌন হয়রানি, শ্লীলতাহানি ও হুমকির অভিযোগে মোঃ জাহাঙ্গীর…

8 minutes ago

জাহাজ শিল্পের জটিলতা কমাতে দ্রুত টিএসডিএফ স্থাপনের নির্দেশ

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দেশের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও নির্মাণ শিল্পের বিদ্যমান জটিলতা সহজ করার…

13 minutes ago

আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক মীমাংসা কঠিন, জানালেন তথ্য উপদেষ্টা

আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক মীমাংসার বিষয়টি বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য গ্রহণ করা কঠিন বলে মন্তব্য…

15 minutes ago

রাঙামাটিতে হাসিনা বেগম হত্যায় যুবকের মৃত্যুদণ্ড

রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে চাঞ্চল্যকর হাসিনা বেগম ওরফে সুমি হত্যা মামলায় মূল অভিযুক্ত মোহাম্মদ মাহিবুর কামালকে মৃত্যুদণ্ড…

16 minutes ago

This website uses cookies.