Header Premium (728×90)

তীব্র উষ্ণতায় ৫ বছরে সুইজারল্যান্ডের ২০ শতাংশ হিমবাহ গলল

শীতকালে তুষারপাত কমে যাওয়া এবং ইউরোপজুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রার প্রভাবে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো অতি দ্রুত গলে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে দেশটির হিমবাহগুলোর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ বরফ হারিয়ে গেছে। কেবল চলতি ২০২৬ সালেই বরফের পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সুইজারল্যান্ডের গ্লেসিয়ার মনিটরিং নেটওয়ার্ক (গ্লামোস) এবং সুইস একাডেমি অব সায়েন্সেসের ক্রায়োস্ফিয়ার পর্যবেক্ষণ কমিশনের যৌথ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া জলবর্ষে হিমবাহগুলোর বরফ গলার হার ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম। বরফ গলা ও তুষার জমার পরিমাণ মাপতে গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে গ্লামোসের একটি গবেষক দল সুইজারল্যান্ডের ২৩টি হিমবাহ পরিদর্শন করে। পশ্চিম সুইস আল্পসের সেক্স রুজ হিমবাহে গত জুলাই মাসে চার মিটার উঁচু একটি পরিমাপক খুঁটি বরফের মধ্যে বসানো হয়েছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শুরুতে গিয়ে দেখা যায়, খুঁটিটির তিন মিটারই বরফের বাইরে বেরিয়ে এসেছে।

গবেষক ও গ্লামোসের প্রধান ম্যাথিয়াস হুস জানান, জুন ও জুলাইয়ের তীব্র তাপপ্রবাহ বাদ দিলেও কেবল আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেই প্রায় তিন মিটার বরফ গলে গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার মিটার উচ্চতায় এত দ্রুত বরফ গলে যাওয়ার ঘটনা আল্পস অঞ্চলের ছোট হিমবাহগুলোর অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিভিন্ন হিমবাহের গড় পুরুত্ব ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। কিছু হিমবাহের নিচের দিকের সরু প্রান্তে এই ক্ষয়ের পরিমাণ ১০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে।

ম্যাথিয়াস হুস আরও উল্লেখ করেন, এই ব্যাপক বরফ গলার পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চলতি বছর সুইজারল্যান্ডে গ্রীষ্মকাল ছিল রেকর্ড উষ্ণ। পাশাপাশি শীতকালেও তুষারপাত অনেক কম হয়েছিল। ফলে গরমের শুরুতে হিমবাহগুলো সুরক্ষামূলক তুষারের পর্যাপ্ত আবরণ পায়নি। এর ফলে ছোট হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে এবং কোনো কোনোটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বড় হিমবাহগুলোও বিপুল পরিমাণ বরফ হারিয়েছে।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহগুলো থেকে প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন লিটার পানি গলে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ পানি দেশটির সব পরিবারের এক বছরের মোট ব্যবহারের চার গুণেরও বেশি। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে পানীয় জলের সরবরাহে মারাত্মক সংকট তৈরি করতে পারে। এছাড়া পর্যটন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে সুইজারল্যান্ডের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪ শতাংশ নিয়োজিত। ম্যাথিয়াস হুস বলেন, হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে পাহাড়ের চিরচেনা রূপ বদলে যাচ্ছে; ধবধবে সাদা পাহাড়গুলো ক্রমেই ধূসর ও কালো বর্ণ ধারণ করছে।

হিমবাহের পানি মূলত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের হ্রদগুলো পূর্ণ রাখতে এবং ইউরোপের প্রধান নদীগুলোর পানির উৎস হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্রাসেলসের ভ্রাইয়ে ইউনিভার্সিটির হিমবাহবিজ্ঞানী হ্যারি জেকোলারি বলেন, শুষ্ক ও গরম গ্রীষ্মে হিমবাহগুলো মানুষের জন্য পানির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। কিন্তু হিমবাহ ছোট হয়ে গেলে গলনের জন্য পর্যাপ্ত বরফ থাকে না, ফলে গ্রীষ্মকালীন পানির সরবরাহ কমে যায়। ইউরোপের আল্পস অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন পানির সর্বোচ্চ সরবরাহের সময়টি ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে বলে তিনি সতর্ক করেন।

জেকোলারি আরও সতর্ক করে বলেন, হিমবাহের এই দ্রুত পরিবর্তন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। তাছাড়া গলে যাওয়া বরফের পানি শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে মেশায় বৈশ্বিক উপকূলীয় এলাকাগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়বে। হিমবাহ রক্ষায় বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি টেনে ধরার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ব যদি দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে, তবে সুইজারল্যান্ড ও আল্পসের হিমবাহগুলোর অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বরফ রক্ষা করা সম্ভব।

গবেষণায় দেখা গেছে, উষ্ণতা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে এই হিমবাহগুলোর ৯০ শতাংশেরও বেশি আয়তন হারিয়ে যেতে পারে। তবে বৈশ্বিকভাবে উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ২১০০ সালের মধ্যে হিমবাহের ক্ষতি ২৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হতে পারে। অন্যথায় এই ক্ষয়ের পরিমাণ ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। জেকোলারি স্পষ্ট করে বলেন, ২১০০ সালের পরও হিমবাহের এই ক্ষয় প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তাই ভবিষ্যতে কতটা বরফ টিকে থাকবে, তা নির্ধারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রতিটি শূন্য দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

Recent Posts

মালয়েশিয়ায় পাহাড়ধসে নিখোঁজ বাংলাদেশি শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার

মালয়েশিয়ার লোজিন হাইল্যান্ডসে পাহাড়ধসের ঘটনায় নিখোঁজ বাংলাদেশি শ্রমিক মো. ফাহাদ হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।…

4 minutes ago

বাকেরগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক কলসকাঠী শিবমন্দির সংরক্ষণের দাবি

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কলসকাঠীতে আজও ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার আমলে নির্মিত…

5 minutes ago

সৈয়দপুরে উর্দুভাষীদের লংমার্চ, স্থায়ী পুনর্বাসনসহ ৪ দফা দাবি

নীলফামারীর সৈয়দপুরে স্থায়ী পুনর্বাসন ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করাসহ চার দফা দাবিতে লংমার্চ করেছেন স্থানীয়…

9 minutes ago

২৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তন, থাকবেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪তম সমাবর্তন আগামী ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি এবং গেস্ট…

17 minutes ago

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: রশিদুজ্জামান মিল্লাত

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছেন, দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা…

20 minutes ago

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ১০০ শিক্ষককে জাতীয় সম্মাননা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত ১০০ জন শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে গুণী…

25 minutes ago

This website uses cookies.